ভগৎ সিং
“ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়ে ঘাড় হেঁট করে বসে পড়লে রাস্তাটাই জোড়া হয়, রাস্তার পাথর সরিয়ে এগিয়ে যাওয়ার বদলে আমরা অন্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াই”। ১৯২৭ সালের গোঁড়ার দিকে এই উক্তি করেছিলেন সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী বীর ভগৎ সিং।
জন্ম: ৫ই অক্টোবর, ১৯০৭, লায়লপুর জেলায়, পাঞ্জাবে।
পিতা:- সর্দার কিসন সিংহ
ফাঁসি: ২৩ মার্চ,১৯৩১ লাহোর কেন্দ্রীয় কারাগারে।
যাঁর লক্ষ্য ছিল ভারতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বলতে শোষণ, দারিদ্র্য, অসাম্য থেকে জনগনের মুক্তি।রাজনৈতিক স্বাধীনতা চেয়েছিল কংগ্রেস। মসনদে বসাই ছিল সেই সময় কংগ্রেস নেতাদের একমাত্র লক্ষ্য।
১৯২৬ সালে কমরেড ভগৎ সিং ,সুকদেব,ভগবতীচ্ছেন, যশপাল প্রমুখ চরমপন্থী স্বাধীনতা সংগ্রামীরা “নওজোয়ান ভারত সভা”প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই সংগঠন মূলত তাঁরা তৈরি করেছিলেন গুপ্ত সংগঠনের কাজের জমি প্রস্তুত করার জন্য ও জনগণের মধ্যে উগ্র জাতীয়তাবাদের প্রসার ঘটানোর জন্য। এই সংগঠনের প্রথম সম্পাদক ছিলেন ভগৎ সিং ও প্রচার সম্পাদক ছিলেন ভগবতী চরণ । এই সংগঠন সে কালে বৈজ্ঞানিক বস্তুবাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিচালিত হতো।
নওজওয়ান সভার উদ্দেশ্য ছিল সেকালের কংগ্রেসের গান্ধীবাদী, সংস্কারবাদী নীতিরও বিরোধিতা করে ভারতবাসীকে উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক কাজে প্রেরণা জুগিয়েছিল। ভগৎ সিং সব সময়ই তাঁর কমরেড বন্ধুদের সমাজবাদ ও সেই সম্পরক্যে রাজনৈতিক তর্ক বিতরক্যে অনুপ্রাণিত করতেন। কখনোই নিজের মতামত অন্যান্য সংগ্রামী বন্ধুদের মধ্যে চাপিয়ে দিতেন না।
কানপুরের গণেশ শঙ্কর বিদ্যার্থীর নেতৃত্বে “কানপুর মজদুর সভার”সাথে গভীর যোগাযোগ রাখতেন ভগৎ সিং।
তিনি বলতেন ইংরেজের অধীনতার বিরুদ্ধ্যে সংগ্রাম লড়াইয়ের প্রথম ধাপ। শেষ লড়াই লড়তে হবে শোষণের বিরুদ্ধ্যে।তা সে শোষণ মানুষ মানুষকেই করুক বা এক রাষ্ট্র অপর রাষ্ট্রকেই করুক(শহীদ স্মৃতি-লেখক ভগৎ সিং এর সহযোদ্ধা শিব বর্মা)।
(ঠিক এই একটি কারণেই স্বাধীনতার পরেও আজ পর্যন্ত কংগ্রেস ভগৎ সিং কে মর্যাদা দেয়নি।)
ভগৎ সিং একজন সুবক্তা, লেখক ছিলেন। সেকালে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ধারাবাহিক লিখতেন। প্রতাপ ও প্রভা(কানপুর), মহারথী(দিল্লী), চাঁদ(এলাহাবাদ) সহ বিভিন্ন পত্রিকায় তাঁর লেখা প্রকাশিত হতো।
ভগৎ সিং এর আগে বিপ্লবীদের কর্মকান্ড ছিল ভারতের স্বাধীনতা প্রাপ্তি। কিন্তু ভগৎ মনে করতেন দেশের স্বাধীনতা একমাত্র কাম্য হতে পারে না। জনগনের অর্থনৈতিক স্বাধীনতাও চাই।
ভগৎ সিং এর শিল্প, সাহিত্য, স্থাপত্য, সৌন্দর্য, সঙ্গীত বিভিন্ন বিষয়ে অনুরাগ ছিল। সেই সময়কার নামকরা লেখক,শিল্পীদের সাথেও তাঁর প্রত্যক্ষ জোগাজাগ ছিল। তিনি মনে করতেন শোষণ ও বৈষম্যের মূলোৎপাটন করার ভিত্তিতে গঠিত সমাজ ও সমাজবাদী রাষ্ট্র গঠনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের সর্বাঙ্গীন বিকাশ সম্ভব। তার প্রচেষ্টায় হিন্দুস্থান প্রজাতন্ত্র নাম পরিবর্তিত হয়ে “হিন্দুস্থান সমাজবাদ প্রজাতন্ত্ সঙঘ গঠিত হয়।
1928 সাল। ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরত্বপূর্ন। বিদেশি ইংরেজ শিল্পপতিদের সুবিধার জন্য ভারতে ইংরেজ শাসন কর্তারা বেশ কয়েকটি শোষণমূলক আই ন এনেছে। সারা দেশজুড়ে প্রতিবাদ প্রতিরোধ। সাইমন কমিশন গঠন হয়েছে। এই কমিশনে সবাই ইংরেজ। তারা যখন বিভিন্ন প্রদেশ পরিদর্শন করেছে চারিদিকে তখন হরতাল, কালো পতাকা প্রদর্শন চলছে। লাহোরে সাইমন কমিশন পৌঁছাতেই লাল লাজপত রায়ের নেতৃত্বে কমিশন কে বাধা দেওয়া হয়। লালাজি পুলিশের লাঠির আঘাতে আহত হন। কিছু দিনের মধ্যেই জীবনাবসান হয় লালজির।
লালাজি কিছুটা ইতিমধ্যে সাম্প্রদায়িক শক্তির সাথে হাত মিলিয়েছিলেন ,জেনেও ভগতের মনে ব্রিটিশের বিরুদ্ধ্যে প্রতিশোধ স্পৃহা বেড়ে ওঠে। পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে ভগৎ। যে পুলিশ অফিসার(স্যান্ডর্স সাহেব) লালাজির উপর লাঠি চালিয়েছিলেন তাঁকে হত্যা করতেই হবে।
১৯২৮ সালের,১৭ই ডিসেম্বর সান্ডর্স কে বাগে পেয়ে প্রথমে রাজগুরু ১টি গুলি করেন মাথায়, তারপর ভগৎ আরো ৩টি গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত
করেন।
কিন্তু এই মৃত্যু ভগৎ কে তৃপ্ত করেনি। কারন বিপলবিরাও মানুষ। কারুর রক্ত ঝরানো তাঁদের আনন্দ দেয় না।তাঁরাও মানবতার পূজারী। তাই তাঁদের মনোভাব স্পষ্ট করার জন্য দিল্লির এসেম্বলিতে তারা একটি ইশতেহার ছড়ান।যাতে লেখা ছিল-
“মানুষের জীবনকে আমরা পবিত্র মনে করি আমরা এমন উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখি যেখানে প্রতিটি ব্যক্তি পূর্ন শান্তি ও স্বাধীনতার সুজোগ পাবে।সেই কারণে মানুষের রক্ত ঝরে বলে আমরা দু:খিত। তবে মানুষের দ্বারা মানুষের শোষণ শেষ করতে, বিপ্লবে কিছু রক্তপাত অনিবার্য”।
এই সময়েই ব্রিটিশ সরকার জোর করে সংসদে ট্রেড ডিসপিউট ও পাবলিক সেফটি বিল পাশ করতে চায়। এই দুটি বিল দেশের পক্ষে এবং জনগণের পক্ষে ক্ষতিকারক। ভগৎ সিং বুঝলেন এ বিল পাশ হলে দেশীয় শিল্প, কৃষকদের প্রভূত ক্ষতি হবে। ইতিমধ্যে দেশের সব শ্রমিক সংগঠন সহ সমস্ত রাজনৈতিক দল একযোগে বিলের বিরোধিতা করতে থাকে। সেই সময়ে শ্রমিক শ্রেণীর জাগরণ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন মোড় নেয়।
ভগৎ সিং রা প্রস্তাব নেয় ট্রেড ডিসপিউট বিলের উপর ভোটাভুটি শেষ হওয়া মাত্র তারা সংসদে বোমা নিক্ষেপ করবে। ভগৎ এও চেয়েছিল যে বোমা নিক্ষেপ করে তারা গ্রেপ্তার বরণ করবে। তিনি জানতেন যে গ্রেপ্তার হলেই ফাঁসির সাজা নিশ্চিত কিন্তু দেশবাসীকে তাঁরা এই বার্তা দিতে চেয়েছিলেন যে আদালতের মঞ্চ থেকে তাঁরা তাদের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ব্রিটিশকে এবং একযোগে দেশবাসীকে শোনাতে পারবেন। সিদ্ধান্ত সফল করার জন্য ভগৎ সিং এর সহকারী যোদ্ধা হিসাবে বটুকেশ্বর দত্তের নাম চূড়ান্ত হলো।
বিলের উপর সদস্যদের ভোট দানের পর স্পিকার বিঠলভাই প্যাটেল যেই ফল ঘোষণা করতে যাচ্ছেন সেই মুহূর্তে বোমা বিস্ফোরণ।ভবন ধোঁয়ায় ধোঁয়া কীর্ন। চারিদিকে সবাই পলায়ন করতে ব্যস্ত। দর্শকের আসন থেকে শ্লোগান সংসদ ভবনে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে “ সর্বহারা শ্রেণী চিরজীবী হোক, সাম্রাজ্যবাদ ধ্বংস হোক, ইনকিলাব জিন্দাবাদ”।এর সাথে সাথে তাঁরা সংসদ ভবনে ইশতেহার ছড়াচ্ছিলেন। ইচছা করলেই ভিড়ে মিশে তারা পালাতে পারতেন। সংসদ ভবনের নকশা প্রস্তুত করেছিলেন বিপলবি জয়দেব।
ভগৎ সিং ও বটুকেশ্বর এর আজীবন জেল হয়। আদালতে ভগৎ ও দত্ত বিবৃতি দিয়ে বলেন-
“ আমরা মানুষের জীবনকে অশেষ পবিত্র মনে করি ও মানবজাতির মঙ্গল চাই। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদের ভাড়াটে সিপাহীদের মত বিনা অনুতাপে হত্যা করতে শিখি নি কাউকে। বিপলবি হলো জগতের নিয়ম। এটাই মানব প্রকৃতির রহস্য। আমাদের বর্তমান পরিস্থিতিতে বিপ্লবের উদ্দেশ্য কিছু ব্যক্তির রক্তপাত করা না। আমাদের উদ্দেশ্য মানুষের দ্বারা মানুষের শোষণ ব্যবস্থাকে শেষ করে দেশের জন্য আত্ম নিয়ন্ত্রণের অধিকার কায়েম”।
ভগৎ সিং ধর্মের ও ঘোর বিরোধী ছিলেন।তাঁর এক সাথী ফনিন্দ্রনাথ ঘোষ ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর (ফনিন্দ্র নাথের বক্তব্য ছিল ঈশ্বর সব কিছুর নিয়ন্ত্রক।সব তাঁর ইচ্ছায় হয়।) ভগৎ সিং তাঁর কথার উত্তরে তর্কে জা বলেছিলেন সে দিন-
“আপনার পথ অকর্মণ্যতার, সব কিছু ছেড়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকার পথ,যুবকদের ভাগ্যবাদের নেশা খাইয়ে গুম পাড়িয়ে রাখার পথ”। আমি এ পথ বিশ্বাস করিনা।
আপনি সর্ব শক্তিমান ঈশ্বরের কথা বলছেন। আমি জিজ্ঞাস করি ঈশ্বর সর্ব শক্তিমান হওয়া স্বত্বেও অন্যায়, অত্যাচার, ক্ষুধা, দাসত্ব, অসাম্য, মহামারী, হিংসা, যুদ্ধ প্রবৃত্তিকে শেষ করে দেয় না কেন?এসব যদি ভগবান শেষ নাই করতে পারে তাহলে তাকে ভালো ভগবান বলি কি করে? আর যদি শেষ নাই করতে পারেন তাহলে তিনি সর্ব শক্তিমান কি ভাবে হন?
ভগৎ সিং জেল খান ও আদালত কে বাড়ে বাড়ে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনের প্রচারের মঞ্চ হিসাবে ব্যবহার করেছিলেন। বন্দীদের স্বাচ্ছন্দের দাবিতে অনশন করেছেন ৬৩ দিন একটানা। জেলের মধ্যে বিভিন্ন মার্ক্সবাদী বই, ভারতের শ্রমিক আন্দোলন, মিরাট মামলা সহ বিভিন্ন পত্রপত্রিকা পাঠ করতেন।আদালতে বিচার চলাকালিনী একবারের জন্যও নিজের মুক্তির সমর্থনে কোন বক্তব্য পেশ করেন নি। যদিও তিনি জানতেন তাঁর ফাঁসি হবে।
২৩ সে মার্চ,১৯৩১ সালে ভগৎ সিং ও তাঁর সাথী কমরেড দের ফাঁসি হয়। ফাঁসির মঞ্চে ওঠার সময় ভগৎ ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট কে বলেছিলেন-
“ম্যাজিস্ট্রেট ,আপনি সত্যি ভাগ্যবান।কারন আপনি এই দৃশ্য দেখার সুজোগ পাচ্ছেন।
মৃত্যুর পূর্বে শেষ চিঠিতে লিখলেন-” অতি শীঘ্রই শেষ সংগ্রামের দুন্দুভি বাজবে। তার পরিণাম হবে চূড়ান্ত। সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজির দিন ঘনিয়ে আসছে। আমরা এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগদান করেছিলাম এবং আমরা এর জন্য গর্ববোধ করি।”
ভগৎ সিং,সুখদেব, রাজগুরু তিনজনের একই দিনে ফাঁসি হয়।কিন্তু তাঁদের আদর্শের প্রতি বিশ্বাস আজো তাঁদের অমরত্ব্ দিয়েছে।
কিছু প্রশ্ন:-
-----------
আজ যখন কিছু মানুষকে আদর্শচ্যুত হতে দেখা যায় সমাজে তখন তাঁদের ঘৃণা করতে শিখিয়েছিলেন ভগৎ সিং। আপনারা আদর্শ চ্যুত ব্যক্তিদের কি ঘৃণা করেন?
ভগৎ সিং এর প্রয়ান দিবস কেন আজ ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদার সাথে সরকার পালন করে না? বর্তমান দেশে সরকার ভগৎ সিং এর আদর্শের পরিপন্থী কেন?
স্বাধীনতা পূর্ববর্তী যে সমস্ত কংগ্রেস নেতা ব্রিটিশের সাথে গলা মিলিয়ে ভগৎ সিং কে সন্ত্রাসবাদী বলেছিলেন তারা কি সত্যি জাতীয়তাবাদী ছিলেন?
ভগৎ সিং এর প্রয়ান দিবস কি মর্যাদার সাথে সংসদে পালন করা উচিত নয়?
ভগৎ সিং অমর রহে
ইনক্লাব জিন্দাবাদ
তথ্য সংগ্রহ করেছি যে দুটি পুস্তক থেকে:-
১: কেন আমি নাস্তিক(লেখক ভগৎ সিং)
২:- শহীদ স্মৃতি। লেখক শিব বর্মা(সহযোদ্ধা ভগৎ সিং এর)

Comments