সাগরপাড়ের রানী ভাইজ্যাক
ভারতের পূর্ব উপকূলের রানী ভাইজ্যাক। পূর্বঘাট পর্বতমালার কোলে অবস্থিত এ শহরে পাহাড়, সমুদ্র, নদী, জঙ্গল মিলেমিশে একাকার। ওরা যেন এ শহরে কানেকানে ফিসফিসিয়ে কথা বলে দিবারাত্রি একে অপরের সাথে বিরামহীন। আমার অনেক দিনের ইচ্ছা ভাইজ্যাক ঘুরে দেখার। কিন্তু সে ইচ্ছা সাধ্যের মধ্যে হলেও বিভিন্ন কারনে সে সাধ আর মেটে না। হিমালয়ের ডাককে তুচ্ছ করে কোন বছরই ইচ্ছা থাকলেও পরিকল্পনা করে উঠতে পারি না ভাইজ্যকের ডাকে সারা দিতে। কিন্তু গত বছর ডিসেম্বরে কন্যার ইচ্ছাকে মর্যাদা দিতে মনস্থির করলাম এবছর ভাইজ্যাক যেতেই হবে। তিনমাস আগে অর্থাৎ সেপ্টেম্বরে,২০১৯ এ টিকিট কেটেই রেখেছিলাম। অবশেষে নির্দিষ্ট দিনে চড়ে বসলাম হাওড়া থেকে ইস্টকোষ্ট এক্সপ্রেসে। পরের দিন ভোরেই পৌঁছে গেলাম বিশাখাপত্তনম স্টেশনে।
বিশাখাপত্তনম ভারতের পূর্ব উপকুলে অন্ধ্রপ্রদেশের একটি সমুদ্র বন্দর। এই শহর ওয়ালটেয়ার বা ভাইজ্যাক নামে পরিচিত। এই বন্দরনগরী একটি ব্যস্ত বাণিজ্য কেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা কেন্দ্র। এখানে আছে ভারতীয় নৌবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় সদর দপ্তর। আর আছে সরকারি ইস্পাত কারখানা, ভারী শিল্প উদ্যোগ এবং ভারতের সর্ববৃহৎ জাহাজ নির্মাণ কেন্দ্রটি। ভালুরের হিন্দু দেবতা বিশাখার নাম অনুসারে এই শহরটি পূর্বঘাট পর্বতমালায় বঙ্গোপসাগরে তীরে একটি প্রাকৃতিক পোতাশ্রয় এবং আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র।
ঋষিকন্ডা বিচ
বিশাখাপত্তনম কলিঙ্গ রাজ অশোকের অধীনে ছিল খ্রী পুঃ ২৬০ সালে এবং ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত উৎকল রাজ্যের অধীনে। তার পর চলে যায় অন্ধ্ররাজ ভেঙ্গি এবং পরে পল্লব রাজের। এই শহরের নামকরণ নিয়ে শোনা যায় একাধিক গল্প। একাদশ শতাব্দীতে অন্ধ্রপ্রদেশের রাজা বারাণসী যাত্রার সময় বিশ্রাম নিয়েছিলেন এখানে। সেই সময় তিনি কার্তিকের (বিশাখা) মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে পুজো করেন। সেই থেকেই জায়গার নাম বিশাখাপত্তনম। পরে ১৭৬৮ সালে শহরের দখল নেয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ব্রিটিশরা বিশাখাপত্তনমকে সঠিক উচ্চারণ করতে পারতো না। ওরা বলতো ভিজাগপটনাম বা ভিজাগ বা ভাইজ্যাগ ।সেই থেকে এই শহর ভাইজ্যাগ নামে পরিচিত। সে যাই হোক বর্তমানে সাজানো গোছানো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এ শহর বিদেশের যে কোন শহরের থেকে কোন অংশে কম সুন্দর নয়।
ভোর ৫ টা নাগাদ ইস্টকোষ্ট এক্সপ্রেস বিশাখাপত্তনম স্টেশনে পৌঁছায় যখন তখনও ঘুমের ঘোর চোখে কাটে নি। স্টেশন থেকে বেরিয়েই পরিচয় হলো স্থানীয় ট্যাক্সি ড্রাইভার রাজু ভাইয়ের সঙ্গে। ভারী সুন্দর ব্যবহার। প্রথম পরিচয়েই উনি প্রেমে পড়লেন আমাদের । আমাদের কোন হোটেল বুকিং না থাকায় এদিক সেদিক চারটি হোটেল ঘুরিয়ে দেখালেন। উনি বলেছিলেন এই সময় ভাইজ্যাকে হোটেল পাওয়া কঠিন। যাই হোক ভোর বেলাতেই উনি আমাদের নিয়ে গেলেন সমুদ্র তীরে এপেক্স হাসপাতালের সন্নিকটে অবস্থিত পদ্মাবতী লজে, ঘরও মিলে গেল। এখানেই আমরা চারদিনের জন্য থাকব। খুব সুন্দর দেখতে না হলেও এই হোটেলটি অবস্থানগত কারনে সুন্দর । যদিও এই সময় ভাইজ্যাক শহরে হোটেলের খরচ বড্ড বেশি, তা সত্ত্বেও এই হোটেলের ভাড়া মোটামুটি আয়ত্তের মধ্যেই। হোটেলের ঘরে যাবার আগে রাজু ভাইকে গাড়ির ভাড়া দিতে গেলে উনি বলেন -সকালে ১০ টার পর এসে নিয়ে যাবেন, কথা বলবেন পরবর্তী ভ্রমনের বিষয়ে। যাই হোক এবেলায় আপাতত আমাদের কোন কাজ নেই, তাই চা- বিস্কুট খেয়ে স্নান করে ঘুমানোই কাজ। কিন্তু তা আর শুনবে কেন আমার কন্যা। কিছুক্ষন পরই আবদার "সমুদ্রের ধারে নিয়ে চলো। " অগত্যা হেঁটে হেঁটে রামকৃষ্ণ বিচের আশেপাশে কিছুক্ষন ঘুরে বেড়ানো। এখানে আসার সময় শুনলাম " ফায়ারিং" এর শব্দ। স্থানীয়দের জিজ্ঞাসা করায় বললেন -এ আওয়াজ নৌসেনাদের কামানের। ছুটে গেলাম ওই দিকে, দেখলাম কামান থেকে আকাশের দিকে গুলিবর্ষণ। এ দৃশ্য সচরাচর দেখা যায় না। আজ কন্যার আবদারে সমুদ্রতটে উপস্থিত হয়ে আমি সে দৃশ্য দেখতে পেলাম। এটা সেনাদের রুটিন মহড়া।
অনন্ত গিরি থেকে পাখির চোখে দেখা সাগর
ফিরে এসে স্নান ও হালকা টিফিন করে কিছুক্ষন বিশ্রাম তারপর বিকালে একটি অটো রিক্সা ভাড়া করে পৌঁছে গেলাম ইসকনের নির্মিয়মান মন্দিরে। যদিও এখনো মন্দিরের নির্মাণ কার্য সম্পন্ন হয়নি, তবুও ভালো লাগলো। দুই তিন বছর পর এই মন্দিরও দর্শনার্থীদের ভিড়ে গমগম করবে। এখানে পরিচয় হলো মায়াপুরের কয়েকজন সাধুর সাথে। এরপর সন্ধ্যায় গেলাম রামকৃষ্ণ বিচ সন্নিকটে রামকৃষ্ণ মন্দিরে। তখন সবে আরতির তোড়জোড় শুরু হয়েছে। সারিবদ্ধ ভাবে ভক্তরা বসে। আমরাও আসন গ্রহণ করলাম। আরতি শেষে ফিরে এলাম ভাইজ্যাক "কালিবাড়িতে"। দক্ষিনেশ্বরের মন্দিরের আদলে তৈরি এই মন্দিরটি ছোট হলেও বেশ সুন্দর। একেবারে রামকৃষ্ণ বিচের উপরেই। এই অঞ্চলটি সন্ধ্যায় বেশ ভিড়ও হয়। বিভিন্ন ব্যবসায়ীরা তাদের পসরা সাজিয়ে ব্যবসায় ব্যস্ত। পর্যটকদের ভিড়ে এই অঞ্চলটি প্রতি সন্ধ্যায় বেশ জমজমাট। তাছাড়া সব বয়সের ভ্রমনার্থীদের মনোরঞ্জনের জন্য রামকৃষ্ণ বিচের পার্কগুলি বেশ সাজানো গোছানো। এখানে আছে জিম করার ব্যবস্থা, শিশু উদ্যান, পার্ক ইত্যাদি। পার্কে বসে আছি, ফোন এলো রাজু ভাইয়ের। আমি বিচে ডেকে নিলাম ওনাকে । পরের দিনগুলির জন্য ভ্রমনের পরিকল্পনা করতে হবে। ভারী সুন্দর ব্যবহার রাজুর। পরিকল্পনা শেষে রাতের খাবার খেয়ে ফিরে এলাম হোটেল পদ্মাবতীতে। আজ আর বেশি রাত করে ঘুমানোর ইচ্ছা নেই। শরীর ক্লান্ত। তাছাড়া আগামীকাল সকাল থেকেই আবার ছোটাছুটি করতে হবে।
পরের দিন ভ্রমণ শুরু হল "সীমাচলম মন্দির" দর্শনের মধ্য দিয়ে। সীমাচলম মন্দিরটি ভাইজ্যাগ থেকে ১৬ কিঃমিঃ দূরে পাহাড়ের উপরে অবস্থিত। এই মন্দিরে আছে বিষ্ণুর নৃসিংহ অবতারের মূর্তি যাতে সব সময় চন্দনের প্রলেপ লাগান থাকে। রোজই অসংখ্য ভক্ত এই মন্দিরে পূজো দিতে আসেন। শোনা যায় শ্রী চৈতন্যদেবও এই মন্দিরে এসেছিলেন। হোটেল থেকে গাড়ি ছেড়ে কিছুক্ষনের মধ্যেই এসে দাঁড়ালো সীমাচলম পাহাড়ের পাদদেশে। এবার উপরে ওঠার পালা। গাড়ি না থাকলে পাহাড়ে ওঠার আলাদা বাসও পাওয়া যায়। পাকদণ্ডী বেয়ে গাড়ি উঠে চললো। নীচের বাড়ি ঘর গাছপালা, মন্দির ছোটো থেকে আরো ছোটো হতে লাগলো। মিনিট পনের বাদে গাড়ি এসে থামলো হাজার ফুট উচুঁ পাহাড়ের উপর অবস্থিত সীমাচলম মন্দিরে। প্রশস্ত মন্দির চত্বর। সহজে মন্দিরে প্রবেশ করতে গেলে টিকিট কাটতে হয়। তবে আমাদের সেই টিকিট কাটতে হয়নি। ভিড় কম, প্রায় পনেরো মিনিটের মধ্যেই দেবদর্শন হলো। প্রাচীন এ মন্দির। মন্দিরের গায়ে অপূর্ব সব কারূকার্য। অবশেষে বিগ্রহের সামনে এসে দাড়াঁলাম। ডিম্বাকৃতি পাথরের গায়ে নৃসিংহ দেবের ছোট্ট মূর্তি ভালো করে ঠাওর করা যায় না হলুদ, চন্দন আর ফুলমালার আধিক্যের জন্য। ঠেলা গুঁতো খেয়ে কোনও রকমে দেবদর্শন সেরে এবার এসে দাঁড়ালাম প্রসাদ কাউন্টারের সামনে, গ্যাঁটের কড়ি খরচ করে দুটি বড় লাড্ডু প্রসাদ হিসাবে পাওয়া গেল। মন্দিরের নিচের ছোট দোকানগুলি থেকে কিছু কেনাকাটা সেরে আবার উঠলাম গাড়িতে।গাড়ি পাহাড় থেকে নামতে শুরু করল। ফেরার সময় পথের ধারে স্থানীয় এক আদিবাসী মায়ের কাছ থেকে এক কেজি আতা কিনলাম। অপূর্ব তার স্বাদ ও গন্ধ। ড্রাইভার বললেন এখানকার আতা স্বাদে ও গন্ধ্যে অতুলনীয়। খেয়ে দেখলাম সত্যি তাই।
সীমাচলম মন্দির
সিমাচলম মন্দির থেকে নেমে কিছুক্ষন পরই পৌঁছে গেলাম শহরের কেন্দ্রস্থলে ফিশিং হারবারে। শুটকি মাছের গন্ধ্যে নাক ভোঁ ভোঁ করছে। এক সেকেন্ড এই এলাকায় থাকা মানে ভয়ঙ্কর কঠিন কাজ। তবে ডকের ভিতরে পৌঁছে সে গন্ধ কিছুটা কমে এলো, হয়ত আমাদের নাক ওই বিদঘুটে গন্ধের সাথে ততক্ষনে মানিয়ে নিয়েছে। সারিসারি নৌকা, প্রতিটি নৌকার উপরে ভারতের জাতীয় পতাকা। এই নৌকাগুলি করেই গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যায় জেলেরা।
এরপর গাড়ি আবার চলতে শুরু করলো। ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করলাম কোথায় যাচ্ছি এখন। উনি বললেন পাহাড়ের উপরে অবস্থিত "সাগর দুর্গা" মন্দিরে চলেছি। ধীরে ধীরে পাহাড়ি পথে পাক খেতে খেতে পৌঁছে গেলাম সাগর দুর্গা মন্দির প্রাঙ্গনে। এখান থেকে বিশাখাপত্তনম নৌবন্দরটিকে ভারী সুন্দর লাগে। অনেকগুলি সিঁড়ি বেয়ে সাগর দুর্গা মন্দিরে পৌঁছে দেবী দর্শন করে আবার সেই পাকদন্ডী পথে নেমে আসা সমতলে। এরপর পৌঁছালাম " লাইট হাউসে"। এখান থেকে গভীর সমুদ্রের নৌকা বা জাহাজগুলিকে উচ্চ শক্তির আলো দেখিয়ে পাড়ের সন্ধ্যান দেওয়া হয়। কুড়ি টাকা করে টিকিট কেটে লাইট হাউসে পৌঁছে সরু সিঁড়ি বেয়ে সকলেই উঠলাম একেবারে উপরে। অনেকটাই উঁচু। এখান থেকে পাহাড় আর সমুদ্রের বক্ষ জড়াজড়ি করে আলিঙ্গন সব চেয়ে ভালো দেখা যায়। ভাইজ্যাক সেই জায়গা যেখানে পাহাড় সমুদ্র মিলেমিশে একাকার। একজন ভ্রমনার্থী তখন আঙ্গুলের নির্দেশ করে তাঁর বন্ধুদের দেখাচ্ছেন "ডলফিন নোজ"। আসলে সমুদ্রের কোলে একটি পাহাড়কে ঠিক ডলফিনের নাকের মত দেখতে, তাই এহেন নাম। সে যাই হোক লাইট হাউসে দীর্ঘ লাইন দিয়ে উঠে শান্ত নীল সমুদ্রকে দেখার মজাই আলাদা। ইচ্ছা না থাকলেও ধীরে ধীরে নেমে এলাম লাইট হাউস থেকে। এবার গাড়ি চলতে শুরু করল "ইয়ারাডা বিচের" দিকে।
"ইয়ারাডা বিচ" ভারতবর্ষের বিভিন্ন সমুদ্র উপকূলীয় বিচগুলির মধ্যে অন্যতম সুন্দর। এই অঞ্চলে চারিদিকে কাজুবাদাম আর নারকেল গাছের শোভা মনমুগ্ধকর। এই জায়গাটি ভাইজ্যাক ভ্রমনার্থীদের বিশেষ আকর্ষণের। এখানে সমুদ্র উত্তাল। স্নান করা ভীষন কঠিন । ভাইজ্যাকের রামকৃষ্ণ বিচের মত ডুবন্ত পাথরের স্তুপ থাকায় বিপদসঙ্কুলও। তবুও এ বিচটি আমার চোখে ভাইজ্যকের শ্রেষ্ঠ বিচ। এদিকে খিদেও পেয়েছে সকলের। স্থানীয় একটি হোগলাপাতায় ছাওয়া অস্থ্যায়ী হোটেলে চাউমিনের জন্য অনুরোধ করায় হোটেল মালিক হাসি মুখে বানিয়ে দিলেন চিকেন চাউমিন। এরপর বিচের ধারেই একটি মন্দির দর্শন করে আবার চেপে বসলাম গাড়িতে। এদিকে প্রায় বিকাল গড়িয়েছে। সূর্য পশ্চিমাকাশে অস্তগামী। আজকের মত ভ্রমন সূচী এটুকুই ছিল তাই, হোটেলে পৌঁছে একটু বিশ্রাম নিয়ে সন্ধ্যায় পৌঁছালাম "রামকৃষ্ণ বিচ"। এই বিচটি আমাদের হোটেলের একদম কাছেই। এখানে সন্ধ্যায় মিষ্টি বাদাম আর চা, কফি খেতে ভারী মজার। প্রতি সন্ধ্যায় " রামকৃষ্ণ বিচে" জনসমাগম চোখে পড়ার মত। মনে হয় যেন কোন বিদেশের সমুদ্র তীরে বসে আছি।
অসাধারন ইয়ারডা বিচপরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে একটি অটোরিক্সা নিয়ে রওনা দিলাম "বোজাকোন্ডা ও লিঙ্গকোন্ডা"। সম্রাট অশোকের রাজত্বকালে বা তারও আগে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা ধর্মপ্রচারকালে এই স্তুপ নির্মাণ করেছিলেন। পাহাড়ের গাত্রে খোদাই করা বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি , বৌদ্ধ মূর্তি ও স্তুপ এই অঞ্চলে দর্শনীয়। বেশ কয়েক ঘন্টা কাটিয়ে ফিরে আসার সময় দেখি বিভিন্ন বিদ্যালয় থেকে অনেক ছাত্রছাত্রী এসেছে শিক্ষামূলক ভ্রমণে। কথা বললাম শিক্ষক শিক্ষিকাদের সঙ্গে। অটো ছাড়ল, কিছুদূর আসার পর অটো ড্রাইভারের মুখে জানতে পারি এখানে বহু প্রাচীন এক দেবী মন্দির আছে। আমরা যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করলাম । শহরের বুক চিরে পৌঁছালাম প্রাচীন সেই মন্দিরে। ঈশ্বরের পূজা দেবার জন্য স্থানীয় দোকান থেকে ফুল ফল নিয়ে পৌঁছালাম শ্রী নৌকম্বিকা মন্দিরে। এই মন্দির ভাইজ্যাক শহর থেকে ৪১ কিমি দূরে আনাকাপল্লী অঞ্চলের
গোভেরাপেলাম অঞ্চলে। এই আরাধ্য দেবী স্থানীয়দের নিকট বিশেষরূপে আরাধ্য। দূরদূরান্ত থেকে সারাবছর অনেক দর্শনার্থীর আনাগোনা লেগেই থাকে এখানে। স্থানীয় রাজা শ্রী কাকারলাপুদি আপ্পালা রাজু গুরু এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এরপর মন্দির দর্শন করে আবার অটোয় চেপে বসা। দীর্ঘ পথ তবু নতুনের সন্ধ্যানে সে পথে অলিস্যি আসে না। আগামী কাল ভোর ভোর উঠেই সকাল ৬.৪০ এর "কিরান্ডুল প্যাসেঞ্জার" ট্রেনে করে যেতে হবে আড়াকু ভ্যালি। যা আমাদের এ ভ্রমনের বিশেষ আকর্ষণ।
পরের দিন ভোর ৩ টে এলার্মের শব্দে ঘুম ভাঙলো। বিছানা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছা করছে না তবুও উঠতে বাধ্য হলাম। সকালেই ট্যুর ম্যানেজার রাজু ভাই ফোন করলেন । বললেন ঠিক ৫ টার সময় গাড়ি হোটেলের সামনে দাঁড়াবে। আমরা আজ আড়াকু যাব ট্রেনে ,ফিরব গাড়িতে। তাই বিশাখাপত্তনম স্টেশনে গাড়িটি আমাদের পৌঁছে দিয়ে ঘন্টা চার পরে আড়াকু যাবে আমাদের আনতে। স্নান ও প্রাথমিক ক্রিয়াকলাপ সেরে ভোর ৫.৩০ টায় স্টেশনে পৌঁছাই। কিরান্ডুল এক্সপ্রেসে আমাদের রিজার্ভেশন ছিল না ঠিকই কিন্তু স্টেশনে পৌঁছে দেখলাম রাজু আমাদের জন্য জানালার ধারে ছয়টি বসার জায়গা দখল করে রেখেছেন। ঠিক সময়েই ট্রেন ছাড়লো। ধীরে ধীরে ট্রেনের বগি ভরে উঠলো। সকলের দৃষ্টি জানালার দিকে। এ পথে প্রকৃতির নয়নজোড়ানো শোভা পথিককে বারেবারে মুগ্ধ করে। প্রায় দুই ঘন্টা পর একটির পর একটি গুহাপথে পাহাড় ভেদ করে আমাদের ট্রেন এগিয়ে চলেছে আর তখনই ভ্রমনার্থীদের হৈ হৈ আওয়াজ এক আলাদা রোমাঞ্চ সৃষ্টি করছে। বারে বারে উপস্থিত হচ্ছেন হকাররা চা, কফি, স্ন্যাকস, সিঙ্গারা নিয়ে। বেশ মজার। প্যাসেঞ্জার ট্রেন হলেও দীর্ঘ পথের ক্লান্তি গায়ে লাগে নি। বাঙালি মানেই পেটুক। তাই হয়ত সব আয়োজনই IRCTC র পক্ষ থেকে করা হয়েছে। ট্রেনে বেশিরভাগ যাত্রীই দেখলাম বাঙালি। আর যাঁরা স্থানীয় যাত্রী তাঁদের ভোগান্তির অন্ত নেই, কারন তাঁরা বসার জায়গা পান না। তবুও হাসি মুখে মেনে নেন । বেশ কিছুক্ষণ দেরিতে ট্রেন পৌঁছালো আড়াকু স্টেশনে। স্টেশন থেকে বেরিয়ে দেখি আমাদের গাড়ির ড্রাইভার সাহেব উপস্থিত।
জানতে চাইলেন কেমন লাগলো ট্রেনে আসতে। আমরা ঘাড় নেড়ে জানালাম ভালোই লাগলো। তবে বড্ড দেরি হয়ে গেল।
আড়াকু যেখানে এলে স্বপ্ন দেখতে ইচ্ছা হয়
স্টেশন থেকে আমাদের প্রথমে নিয়ে যাওয়া হলো আড়াকু "ট্রাইবাল মিউজিয়ামে"। এদিকে ততক্ষনে খিদেও পেয়েছে। তাই স্থানীয় বাজারের একটি দোকানে চাউমিন ও চা খেয়ে মিউজিয়ামের টিকিট কেটে প্রসস্থ জলাধারের গা ঘেঁষে পৌঁছাই মিউজিয়ামের ভিতর। এখানে সামনের বাগিচায় বিভিন্ন মূর্তি বানানো আছে। বিভিন্ন বাহারি গাছের শোভাও দর্শনীয়। তবে পরিচর্যার অভাব লক্ষণীয়। মনে হলো কয়েক বছর আগে এই মিউজিয়ামের যতটা গুরুত্ব ছিল আজ আর তা নেই। পরপর তিনটি মিউজিয়াম দেখে দ্রুত পা চালিয়ে বেরিয়ে এলাম মিউজিয়ামের বাইরে। বিকালের দিকে এখানে মিউজিয়ামে আদিবাসীদের নৃত্য দেখার মত। কিন্তু তা আর দেখা হলো না। মিউজিয়াম থেকে গাড়ি ছেড়ে এর পর পৌঁছাই আড়াকু “ভিউ পয়েন্ট”। এখানে দাঁড়িয়ে ছবি না তুলে পারবেন না, খুব সুন্দর এই জায়গাটা। বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে শিক কাবাব খেয়ে আবার গাড়িতে উঠে বসা। এখানে কফি কিনতে পারেন খুব ভালো তা বলবো না তবে সস্তায় ভালোই । তবে আমাদের ড্রাইভার বললেন এর পর আমরা কফি গার্ডেনে যাব। সেখানেও কফি পাওয়া যাবে। তাই এখানে না কেনার সিদ্ধান্ত নিই। তামিল ভাষায় গানের ছন্দে গাড়ি চলতে চলতে পৌঁছে গেলাম কফি বাগানে। প্রত্যেকটি গাছেই এই ডিসেম্বর মাসে কফির বিচ পাকতে শুরু করেছে। বেশ কয়েকটি ছবি তুলে পৌঁছালাম এক আদিবাসী রমণীর কফি স্টলে। এক কাপ কফি খেয়ে বেশ লাগলো। দাম দর করে বাড়ির জন্য কফি সংগ্রহ করে এবার আমাদের বহু আকাঙ্খিত জায়গা "বোরা কেভের"দিকে রওনা দিলাম। এদিকে কন্যা আবদার জুড়েছে ব্যাম্বু চিকেন খাবার।
ব্যাম্বু চিকেন, এ স্বাদের ভাগ হবে না
গোটা আড়াকু ভ্যালি জুড়েই ব্যাম্বু চিকেনের রমরমা। তবে অনেক সময় চিকেনের বদলে পর্কের ব্যবহার ও হয় শুনেছি। তাই একটু সাবধানী আমি।
বোরা কেভ"বোরাকেভ" পৌঁছে টিকিট কেটে যখন কেভের ভিতর প্রবেশ করছি তখন সূর্য পশ্চিম পথগামী। ঘড়ির কাঁটায় তখন বিকাল ৪ টা। ধীরে ধীরে সাবধানে প্রবেশ করছি কেভের সিঁড়ি বেয়ে। ব্রিটিশ ভূতাত্বিক উইলিয়াম কিং এই গুহা আবিষ্কার করেন। স্টেলাগমাইট ও স্টালাকটাইট খনিজের সংমিশ্রনে যুগ যুগ ধরে এই গুহা তৈরি হয়েছে।গুহার অভ্যন্তরে অনেক পাথরই ঝুলন্ত। যা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। গুহার ভিতরে একটি প্রাচীন শিব লিঙ্গ আছে। এই লিঙ্গ স্বয়ম্ভু। শিবরাত্রির সময় স্থানীয় আদিবাসীরা এই দেবতার পূজা করেন। এসময় বোরাকেভে একটি মেলা অনুষ্ঠিত হয়।
পুরো গুহাটি ঘুরে দেখতে আমাদের প্রায় দুই ঘন্টা সময় লেগে যায়। গুহার ভিতরে অন্ধ্রপ্রদেশ ট্যুরিজিমের উদ্যোগে রঙবেরঙের আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হয়েছে। যা নষ্টালজিক পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। এদিকে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। বার কয়েক ড্রাইভার সাহেবের টেলিফোন বেজে ওঠায় দ্রুত গুহা থেকে বেরিয়ে এলাম। এরপর দীর্ঘপথ পারি দিতে হবে। মাঝে পথে একবার চা খেয়ে আলো আধারি পথে গাড়ি ছুটছে। প্রায় রাত আটটা নাগাদ পৌঁছালাম আমাদের গন্তব্যস্থল সমুদ্র সৈকতের তীরে পদ্মাবতী লজে। ততক্ষণে ক্লান্ত শরীর । আমাদের সঙ্গে কিছুটা মুড়ি, চানাচুর ছিল। তাই সেটুকু খেয়েই গভীর নিদ্রায় নিদ্রিত হলাম কখন যে, তা বুঝিনি।
প্রবেশ পথ বোরা কেভপরের দিন সকালে এলার্মের শব্দে ঘুম ভাঙলো। আজই আমাদের ফিরতে হবে। রাত্রি এগারোটায় ট্রেন। চা খেতে খেতে মোবাইল এপ্সে চোখ রেখে চক্ষু চড়কগাছ। সালিমার এক্সপ্রেস প্রায় ৬ ঘন্টা দেরিতে ছুটছে। বুঝলাম আজ ভোগান্তির শেষ নেই। কিন্তু তার আগে আজ দেখে নিতে হবে ভাইজ্যাকের বাকি জায়গাগুলো। গাড়ি এলো সকাল ৯ টায়। হোটেল ছেড়ে দিয়ে ব্যাগপত্র গাড়িতে তুলে প্রথমে গেলাম " ইন্দিরা গান্ধী চিড়িয়াখানায়"। প্রায় ঘন্টা তিন সময় লাগলো। তারপর গেলাম পাহাড়ের উপরে রামা নাইডু "ফ্লিম স্টুডিওতে"। বেশ সুন্দর লাগলো এই জায়গাটি। স্টুডিও থেকে সমুদ্র সৈকত দেখতে অসাধারন। এরপর ঋষিকন্ডা বিচে পৌঁছে বেশ কিছুক্ষণ আনন্দ উপভোগ। দুপুরের খাবার খেয়ে কিছুক্ষন বিশ্রাম নিয়ে পৌঁছালাম "অনন্তগিরি"। ভাইজ্যাক ঘুরতে গিয়ে যাঁরা অনন্তগিরি যাবেন তাঁদের বলব ড্রাইভারকে আগেই বলবেন রোপওয়ে তে যাবেন। তবে গাড়িতেও ওঠা যায়। এখানে পাহাড়ের উপরে বড় শিবদুর্গার মূর্তি আছে। আছে পিকনিক স্পট। টয়ট্রেন সহ শিশুদের মনোরঞ্জনের জন্য বিভিন্ন খেলাধুলার উপকরণ আছে। আমার কন্যা তো এখান থেকে আসতেই চায় না। এমন ভাবখানি একরাত্রি এখানে থাকলে ভালো হয়। সন্ধ্যা নাগাদ অনন্তগিরি থেকে নেমে পৌঁছালাম "সাব মেরিন" মিউজিয়ামে তারপর "এয়ারক্রাফট মিউজিয়াম"। সত্যি সত্যি বিভিন্ন যুদ্ধে ব্যবহৃত ডুবো জাহাজ এটি। সাধারণ মানুষের জন্য দেখার এই ব্যবস্থা করেছেন ভারতীয় সৈনিকদের পক্ষ থেকে। এরপর পৌঁছালাম নেভির মিউজিয়াম। এটিও ভীষন সুন্দর। ড্রাইভার বললেন এবার আমাদের ভ্রমন সূচী আজকের মত এখানেই শেষ। তাই ওখান থেকে ফিরে রামকৃষ্ণ বিচ সংলগ্ন এলাকায় একোরিয়াম মিউজিয়াম দেখে কিছুক্ষনের জন্য বিশ্রাম নিলাম রামকৃষ্ণ বিচে। ভাইজ্যাককে বিদায় জানানোর সময় একবার গেলাম রামকৃষ্ণ বিচে "কালি মন্দির"দর্শনে।মন সকলেরই খারাপ, এদিকে তখন ঘড়ির কাঁটায় সন্ধ্যা আটটা বাজে। ড্রাইভার অনুমতি নিয়ে গাড়ি ছাড়লেন। আমরা এখন বিশাখাপত্তনম স্টেশন অভিমুখে। কন্যার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি চোখ ছলছল। আবার তো বাড়ি ফিরে সেই গতানুগতিক জীবন। লেখাপড়া, গান, মায়ের বকুনি। ওকে বললাম বাড়ি ফিরে আবার না হয় কোথাও যাব। মন খারাপ করে না।
লিঙ্গ কোন্ডা বৌদ্ধ স্তুপে আমি
স্টেশনে ঢুকে জানলাম ট্রেন প্রায় পাঁচ ঘণ্টা দেরিতে আসবে। অপেক্ষা ছাড়া উপায় নেই। তাই হালকা খাওয়া দাওয়া সেরে রাত্রি নয়টা থেকে প্লাটফর্মের চেয়ারে বসে সময়ের অপেক্ষা।
সহযাত্রীদের সাথে রামকৃষ্ণ বিচে
কিভাবে যাবেন :- হাওড়া থেকে করমন্ডল, ইস্টকোষ্ট সহ বিভিন্ন ট্রেনে যাওয়া যায় ভাইজ্যাক।
থাকবেন কোথায় :- অসংখ্য হোটেল আছে অনলাইন বুকিং করে গেলে সুবিধা।
Comments