খেদায়তলার মেলা
চাকদহ বা চাকদা নদীয়ার একটি প্রাচীন জনপদ। পুরাণে কথিত আছে ভাগীরথী নদী (গঙ্গা) আনয়নকালে প্রচন্ড বর্ষনের কারনে ভগীরথের রথের চাকা এখানে বসে যায়। তিনি সেই চাকা টেনে তোলেন ও প্রকান্ড দহের সৃষ্টি হয়। সেই থেকে নাম হয় 'চক্রদহ' কালক্রমে তা চাকদহ বা চাকদা'তে পরিনত হয়েছে।
হঠাৎ ই একদিন বিকালে ছুটলাম চাকদহ তে।ভাতৃপ্রতিম রাজীবের বাড়ি। থাকা ,খাওয়া আর ভালোবাসার টানে। সন্ধ্যায় পৌঁছিয়ে বাইক নিয়ে চাকদার ঘুরে বেড়ানো মন্দ লাগে না। ব্যবসার রমরমা চোখে পড়ার মতোই। পূজার দরজায় কড়া নাড়ছে, তাই এইসময় একটু বাড়তি তৎপরতা খরিদ্দার ও ক্রেতাদের। রাত্রিতে ই সিদ্ধান্ত হয়, সকালে চিত্রশিল্পী বন্ধুবরেষু তরুণ দার সাথে সকালে দেখা করা হবে। উনিও থাকেন চাকদহতেই। ব্যস্ত মানুষ।
সকালে ঘুম থেকে উঠতে একটু দেরি হয়। রাজীব বলে আজ এক জমিদার বাড়িতে নিয়ে যাবে ।চাকদহ থেকে প্রায় 10 কিমি দূরে রায়বাড়ি। জমিদারের উপাধি রায়, তাই জায়গাটাও রায়বাড়ি নামেই পরিচিত। সকালে তরুণ বাবুর সাথে দেখা করে তিনজনেই বেরিয়ে পড়ি রায়বাড়ির উদ্দেশ্যে। পথের দুধারে বিস্তৃত সবুজ জমি ও গাছগাছালির মধ্য দিয়ে পথে চলতে চলতে এক অনাবিল আনন্দ উপভোগ করা।
ইতিহাসের চাকায় উল্থন ও পতন দুইই থাকে। জমিদারী আজ আর নেই ।কিন্তু তাঁর জরাগ্রস্থতা সাক্ষ্য বহন করছে অতীতের চাকচিক্যের।
জমিদার বাড়ির সুন্দর দরজা, দালান, নহবতখান, রন্ধন গৃহ কালের নিয়মে আজ ভগ্নাবশেষ। ছাদ খসে পড়ছে, দেওয়াল জুড়ে বটবৃক্ষের আলিঙ্গন জমিদারের দম্ভকে চুরমার করে জানান দেয়
“ চিরদিন কাহারা সময় নাহি যায়
আজকে রাজাধিরাজ
কালকে সে ভিক্ষা চায়।”
জমিদার বাড়ির জরাজীর্ণ ছাদ থেকে দেখা যায় বাবুদের তাল পুকুরের সান বাঁধানো ঘাট। একদিন যে ঘাটে স্নান করতেন জমিদার ,জমিদার গিন্নি সহ পরিবার পরিজনেরা। হয়ত সে ঘাটে গ্রামের অন্য কারুর নামার অধিকারটুকুও ছিলনা, সেই ঘাটে স্নান করে আজও গ্রাম্য রমণীরা। জংলাকীর্ন জমিদার বাড়ি আজ শুধুই স্থানীয়দের সূরা পানের গোপন ঠিকানা মাত্র। স্হানীয় পঞ্চায়েত একটু উদ্যোগী হয়ে জায়গাটির পরিচর্যা করে পর্যটন কেন্দ্র বানাতেই পারে। কিন্তু সেখানেও হয়ত কোন লাল ফিতার বন্ধন আছে। অথবা আছে উদাসীনতা।
জমিদার বাড়ি থেকে বেরিয়ে তরুণ দার কাছে শুনলাম পাশের গ্রাম খেদায়তলার মনসা পূজার মেলার কথা। এদিকে দুপুর তখন 1 টা। এত কাছে এসে সর্ব ধর্মের মানুষের মিলন মেলা না দেখে বাড়ি ফিরতেও মন চায় না। তাই গেলাম খেদায়তলার মেলায়। চাঁদের বাম হাতে পূজার ফুল ছুড়ে দেওয়া মা ও এখানে কৌলীন্য পেয়েছে। জমজমাটি মেলা প্রাঙ্গণ। দূর দূরান্ত থেকে এসেছেন ভক্তরা। অনেকগুলি জায়গায় স্থানীয়রা মূর্তির সামনে মাটির পাত্রে দিয়ে রেখেছেন দুধ ও কলা। মায়ের নতুন মন্দির গঠনের কাজও চলছে। শুনলাম আগে এখানে সাপুরেদের ভিড় হতো। কিন্তু এবছর বন দপ্তরের নির্দেশে সাপ খেলা বন্ধ রাখা হয়েছে।
চারিদিকে বিভিন্ন খাবারের দোকান, আইসক্রিম স্টল, লোহা ও কাঠের পণ্যসামগ্রীর ও মাছ ধরার জালের দোকান এই মেলার বিশেষ আকর্ষণ।
দুপুর 3 টে। পেটে র ক্ষিদেও হার মেনেছে আমাদের উচ্ছাসের কাছে। উপরি পাওনা দুজন ফেসবুক বন্ধ তরুণ মন্ডল ও রাজীবকে একসাথে পাওয়া।
এবার ফিরে আসা । জমিদার বাড়ি ও খেদায়তলার মেলাকে স্মৃতির মণিকোঠায় স্থান দিয়ে। বিকালে রাজীবের বাড়ি এসে মায়ের হাতে মর্টনের স্বাদ গ্রহণ করে ফিরে এলাম কালনায়।
একটা কথা না বললে বাকি থেকে যায়। মাসিমা বললেন হ্যান্ড ওয়াশ দিয়ে হাত ধুতে। আমি কিন্তু ধুইনি । ওই গন্ধ যতক্ষন ছিল ততক্ষণ শুধুই নাকে শুকেছি আমি।
Comments