ব্যান্ডেল-কাটোয়া রেলপথ ধরে তীর্থভ্রমন

              ছবি :- সংগৃহিত

ব্যান্ডেল-কাটোয়া রেলপথের ইতিহাস অতি প্রাচীন। একেবারে গঙ্গার তীর ঘেষে এই রেলপথের যাত্রা শুরু হয়েছিল স্বাধীনতারও অনেক কাল আগেই ১৯১৩ সালে। তৎকালীন ভারত সরকারের(ব্রিটিশ) হাত ধরেই এ পথের যাত্রা শুরু। জনসেবার জন্য নয় আসলে, ব্রিটিশ বেনিয়ারা তাঁদের নিজেদের ব্যবসা বাণিজ্যের স্বার্থেই এ পথ তৈরি করতে বাধ্য হয়েছিল। এপথ উত্তরবঙ্গের সাথে দক্ষিণবঙ্গের যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছিল দেশের স্বাধীনতা প্রাপ্তির শেষ কয়েক দশকে। ব্যান্ডেল থেকে কাটোয়ার দূরত্ব রেলপথে ১৪৪কিমি অর্থাৎ ৮৯ মাইল। 


স্বাধীনতা উত্তরকাল থেকেই গঙ্গা তীরবর্তী এই অঞ্চলগুলি ছিল একসময়ে দুইবাংলার  শিক্ষা, সংস্কৃতি, ধর্ম, বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র। বল্লাল সেনের সময়ে বা তারও পরবর্তীকালে বর্ধমান রাজাদের সময়কালে এসব অঞ্চল হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলমান প্রভৃতি ধর্মাবলম্বী মানুষের মিলেমিশে বসবাসের সুদীর্ঘ এক ইতিহাস রচিত হয়েছিল সেকালে। যা আজও এই জনপদে বর্তমান। 


আজ আমি সেইসব ইতিহাস লিখতে বসিনি। বরং এই রেলপথ ধরে বিভিন্ন জনপদের ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় শহর ও গ্রামগুলি তুলে ধরতে চাইছি পাঠকমহলে। আশা করি ভ্রমন উৎসুক পাঠকদের কাজে লাগবে। 

একসময় ব্রিটিশ আমলে এই পথ ধরে স্টিম ইঞ্জিনবাহিত ও কয়লা ইঞ্জিন বাহিত ট্রেন  চলতো । কালের নিয়মে সেসব আজ ইতিহাসের পাতায়। স্বাধীনতার পর এপথে ধীরে ধীরে কয়লার ইঞ্জিনও উঠে গিয়ে ডিজেল চালিত ট্রেন ও পরবর্তী সময়ে বর্তমানে ইলেকট্রিক ট্রেন চালু হয়েছে। 


১৯৯৪-৯৬ সালে বামফ্রন্টের সাংসদ সাইফুদ্দিন চৌধুরীর ঐকান্তিক প্রয়াসে এ পথে প্রথম বিদ্যুৎ চালিত ট্রেন পরিষেবা শুরু হয়। নব্বইয়ের দশকের আগে এ পথে কলকাতা পৌঁছাতে একসময় যাত্রীদের মুড়ি, গুড় বেঁধে যেতে হতো। কাটোয়া থেকে হাওড়া পৌঁছাতে সময় লাগতো প্রায় ৬ ঘন্টা। সিঙ্গেল লাইন, ক্রসিং এর সময় এক একটি স্টেশনে ট্রেন দাঁড়িয়ে থাকতো প্রায় ১৫-২০ মিনিট। আজ সে সবও ইতিহাসের পাতায় স্থান পেয়েছে। এটাই তো নিয়ম। 


তারপর ১৯৯৪-১৯৯৬ সাল সিঙ্গেল লাইনেই বৈদ্যতিক ট্রেন চালু হয় প্রথমে জিরাট পর্যন্ত। তারপর নবদ্বীপ পর্যন্ত ও পরে কাটোয়া পর্যন্ত বৈদ্যতিককরন করা হয়। কিন্তু তাতেও সমস্যা মেটে না। যাত্রীদের কলকাতা পৌঁছানো বা কলকাতা থেকে ফেরা সেসময়ে যেন এক নির্মম যন্ত্রণার ছিল। ২০১৪-১৫ সালে এপথ ডবল লাইন ট্রেন পরিষেবা চালু হয়। আজ কলকাতার মানুষ বা কাটোয়ার মানুষ অনায়াসেই সূর্যদয়ের সময় ট্রেন ধরলে সব কাজ মিটিয়ে সূর্য ডোবার আগেই গন্তব্যে প্রিয়জনদের কাছে পৌঁছে যেতে পারেন। এই পথে যাঁরা এসেছেন তাঁরা জানেন এই ব্রডগেজ রেলপথে আছে মোট ২৮ টি স্টেশন। তারমধ্যে বাঁশবাড়িয়া- ত্রিবেণী, ডুমুরদহ, সোমরাবাজার, গুপ্তিপাড়া, কালনা, বাঘনাপাড়া, সমুদ্রগর, নবদ্বীপ, পূর্বস্থালি, অগ্রদ্বীপ ও কাটোয়া ভ্রমণপিপাসু বাঙালির কাছে পরিচিত গন্তব্য।  ইচ্ছা করলেই ট্রেন থেকে নেমে কয়েক ঘন্টা সময় ব্যয় করেই দেখে নেওয়া যায় এই স্থানগুলিকে । কলকাতার অনেক মানুষকেই এখন দেখি অফরুট ভ্রমণে আগ্রহ প্রকাশ করতে।  তাঁদের উপকারের জন্যই আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস। চলুন আজ মানসভ্রমনে ,সময় সুযোগ থাকলে কোনদিন আসবেন এপথে।


★★★পড়ুন ★★★


বাঁশবেড়িয়া - ত্রিবেণী-ডুমুরদহ


ব্রিটিশ আমলে ত্রিবেণী-বাঁশবেড়িয়া জনপদ ব্যবসা বাণিজ্যের বিশেষ প্রসার ঘটেছিল। ব্যান্ডেলের পরের স্টেশন বাঁশবেড়িয়া, দূরত্ব মাত্র ৭.৫কিমি। একসময় নদীমাতৃক এই জনপদে অসংখ্য জুটশিল্প কারখানা গড়ে উঠেছিল গঙ্গার দুই তীর ধরে। এই জুট মিলগুলি গড়ে ওঠার কারনে এই জনপদে হিন্দিভাষী মানুষের বসবাসও গড়ে ওঠেছিল । সেকারনে এই জনপদে  বাঙালি-অবাঙালি সংস্কৃতি মিলেমিশে একাকার। সব ধর্মের মানুষকেই দেখা যায় এই জনপদে। ছোট্ট এই শহরের কার্তিক পূজা বিখ্যাত। স্টেশনের পাশেই এক পীড় বাবার মাজার আছে। হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই এই মাজারে আসেন ও উপাসনা করেন। তবে বাঁশবেড়িয়ায় অন্যতম প্রধান দর্শনীয় স্থান হলো প্রাচীন হংসেশ্বরী মন্দির ও অনন্ত বাসুদেব মন্দির। 

রাজা নৃসিংহদেব ১৭৯৯ খ্রিষ্টাব্দে এই  হংসেশ্বরী কালীমন্দিরের নির্মাণ শুরু করেন এবং তার মৃত্যুর পর ১৮১৪ খ্রিষ্টাব্দে তার বিধবা পত্নী রাণী শঙ্করী এই মন্দির নির্মাণকর্ম সম্পন্ন করেন। এই মন্দিরের উচ্চতা ৭০ ফুট।  তেরোটি মিনারে প্রস্ফুটিত পদ্মের ন্যায় নির্মিত মন্দিরের ভিতর গর্ভগৃহের অবস্থান। গোলাকার বেদীর ওপর পাথরে নির্মিত শায়িত শিব মূর্তির নাভি থেকে উদ্গত প্রস্ফুটিত পদ্মের ওপর দেবী হংসেশ্বরীর মূর্তি  । এই দেবীমূর্তি নীলবর্ণা, ত্রিনয়নী, চতুর্ভূজা, খড়্গধারিণী ও নরমুণ্ডধারিণী। এই মন্দিরের পাশেই টেরাকোটা নির্মিত অনন্ত বাসুদেব মন্দির অবস্থিত। অনন্ত বাসুদেব মন্দির ১৬৭৯ সালে রাজা রামেশ্বর দত্ত নির্মাণ করেন। দুটি মন্দিরই বর্তমানে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগের অধীনে সংরক্ষিত। মাতা হংসেশ্বরী দেবীর মন্দিরে নিত্য পূজাপাঠের ব্যবস্থা আছে। ভক্তজন প্রতিদিন মাতাকে ভোগ নিবেদন করেন । দ্বিপ্রহরে মন্দিরের গর্ভগৃহ বন্ধ থাকে ,সেই কারনে তখন মাতৃ বিগ্রহ দেখা যায় না । যদিও মূল মন্দিরে প্রবেশের কোন বাধা নাই। বেলা আড়াই ঘটিকায় পুনরায় গর্ভগৃহ খুলে দেওয়া হয়। তখন মাতৃ প্রতিমা দর্শন করা যায় এবং মায়ের কাছে পূজা নিবেদনও করা যায়। ভক্তজন মায়ের ভোগ অন্ন গ্রহণ করতে চাইলে সকাল দশটার মধ্যে মন্দিরের আধিকারিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রসাদ গ্রহণ করতে পারেন।



            হংসেশবরী মন্দির, বাঁশবেড়িয়া

১২ শতকের শেষ চতুর্থাংশে একটি সংস্কৃত ভাষায় লেখা অংশ "পাভনা-দুতাম"-এও এই অঞ্চলের পবিত্রতা সম্পর্কে উল্লিখিত আছে। এই অঞ্চলে  জাফর খান গাজী মসজিদ ও দরগা ও ত্রিবেণীর সঙ্গম দর্শনীয়। ভিন্ন দুই ধর্মের মানুষদের কাছেই ত্রিবেণী অত্যন্ত পবিত্র স্থান।  এই ত্রিবেণী সঙ্গমে গঙ্গাস্নান করে পুণ্যলোভের আশায় বহু মানুষ আসেন । ওড়িশার স্বাধীন হিন্দু রাজা হরিচরণ মুকুন্দদেব ১৫৬৫ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট আকবরের সঙ্গে সন্ধি করে এই অঞ্চলের শাসনভার গ্রহণ করেছিলেন। তারও আগে সপ্তগ্রামে দখলে ছিল পাঠানদের। মুকুন্দদেব আকবরের সহযোগিতায় পাঠানদের উৎখাত করে সপ্তগ্রাম পর্যন্ত তাঁর শাসন কায়েম করেন। ওই সময়েই ত্রিবেণীতে একটি স্নানের ঘাট তিনি নির্মাণ করেন, যা মুকুন্দদেব ঘাট নামে পরিচিত।এই কারনে ঘাটের কাছাকাছি ত্রিবেনীর মন্দিরগুলিতে উড়িষ্যার দৃশ্যমান প্রভাব ফেলেছিল। য়ামুনা, সাধারণত বাংলা ভাষায় যমুনা হিসাবে উল্লিখিত, অতিতে নদীটি গঙ্গার (হুগলী নদী) শাখা হিসাবে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রবাহিত ছিল, কিন্তু বর্তমানে নদীটি গঙ্গা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং বিলীন হয়েছে।


গঙ্গা তীরে অবস্থান ত্রিবেণী মহাশ্মশানের। পুণ্য লাভের আশায় ভিন রাজ্য থেকেও এখানে সৎকারের জন্য দেহ আনা হয়। শ্মশানের একপাশে একটি পুকুর ‘নেতা ধোপানির ঘাট’ হিসেবে প্রসিদ্ধ। কথিত আছে মনসামঙ্গলের নেতা ধোপানি এই পুকুরে দেবতাদের বস্ত্র ধুতেন। এর কিছু দূরেই ত্রিবেণী খেয়াঘাট । এই ঘাটের কাছেই সমাধিস্থ আছেন চিন্তাহারন স্বামীজী। এই সমাধি  মন্দির ছাড়াও ত্রিবেণীর কাছেই জিটি রোডের উপর স্বামীজীর প্রধান মন্দিরটি অবস্থিত। একটু সময় নিয়ে এই জায়গাটাও দেখে নেওয়া যায়। গঙ্গা তীরে মনোরম পরিবেশে এখানে চিরনিদ্রায় শায়িত স্বামীজী চিন্তাহারনজি। 


এই ত্রিবেণী একসময়  অতীতে "মুক্তাবেনী" বা যুক্তাবেনী নামেও পরিচিত ছিল । ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে জেমস রেনেলের বাংলার মানচিত্রে ত্রিবেণীকে "টেরবোনি" নামে অভিহিত করেছিলেন। 

 এখানকার জাফর খান গাজী মসজিদ হল পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের নিকটতম অতিতের বেঁচে থাকা স্মৃতিস্তম্ভগুলির একটি। পাঁচ গম্বুজ বিশিষ্ট এমন মন্দির এখানেই আছে ।মসজিদটির একটি আরবি ক্রমবিন্যাস রয়েছে ১২৯৮ খ্রিস্টাব্দ, যদিও প্রমাণ পাওয়া যায় যে এটি সময়ের সাথে পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। তারিখটি আরও দৃঢ়ভাবে প্রমাণিত হয় যে ১২৭২ সালে মুসলিমদের বাংলার বিজয়ের প্রায় ৬০ বছর পর, নিকটবর্তী এলাকাগুলির সাথে "ত্রিবেনী" জনপদটি জাফর খান কর্তৃক দখল হয়েছিল। মসজিদটির দরজাগুলি হিন্দু বৈষ্ণব ভাস্কর্য খোদিত রয়েছে, যা থেকে অনুমান করা হয় যে মন্দিরের উপর সম্ভবত মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল।


সপ্তগ্রামের শাসনকর্তা থাকাকালীন জাফর খান গাজি বর্ধমানের কালনা পর্যন্ত যাতায়াতের জন্য সড়ক নির্মাণ করেছিলেন। পরবর্তী কালে মানুষের সুবিধার জন্য হুগলির জেলা জজ ড্যানিয়েল স্মিথের চেষ্টায় কুন্তী নদীর উপর একটি ঝুলন্ত সেতু নির্মিত হয়। যা পর্যটকদের কাছে অবশ্যই দর্শনীয়। কারন এই ঝুলন্ত সেতুটি ঋষিকেষের লক্ষণ ঝুলার আদলে তৈরি। শোনা যায় সেই সময় সেতুটি তৈরি করতে অর্থ সাহায্য করেছিলেন ভাস্তারার জমিদার ছকুরাম সিংহ। ইতিহাসের পথ বেয়ে গঙ্গার জল যতই দক্ষিণপথগামী হয়েছে ততই এ অঞ্চলের ভৌগলিক, অর্থনৈতিক অবস্থারও পরিবর্তন হয়েছে। পরিবর্তন হয়েছে মানুষের জীবনশৈলীরও। অতিপ্রাচীন এই জনপদে ইতিহাসের নিয়মেই যেমন বেশ কিছু স্থাপত্য ধ্বংস হয়েছে, তেমনি নতুন ইতিহাস রচিত হয়েছে।  


১৯৬২ সালে  মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায় এর উদ্যোগে এ অঞ্চলে তৈরি হয় তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র। প্রথমে ব্যান্ডেলে তৈরি হওয়ার কথা আলোচিত হলেও পরে জলের প্রাচুর্যের কারনে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি হয় ত্রিবেণীতে।  সেসময় ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত জন কে গোলব্রেথ তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটির উদ্বোধন করেছিলেন। মার্কিন সংস্থা হেস্টিংস হাউজ এটি নির্মাণ করেছিল।


একসময় এই অঞ্চলে ভারতের সর্ব বৃহৎ টায়ার কারখানাও তৈরি করেছিলেন ডানলপ কতৃপক্ষ। যদিও সে কারখানা আজ বন্ধ । সে যাই হোক এবার চলুন ঘুরে আসি ত্রিবেণীর একটি স্টেশন পর ডুমুরদহ গ্রামে।  এই গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন ভক্তি আন্দোলনের বাংলার পুরোধা সাধক শ্রী শ্রী সীতারাম দাস ওঙ্কারনাথ। সারা ভারত জুড়ে সীতারাম অসংখ্য মঠ ও মন্দির গড়ে "হরে কৃষ্ণ" মহামন্ত্রের প্রচার করেছিলেন। 


দেশে যখন ধর্মের উপর অধর্মের শাসন শুরু হয়, তখন আপামর জনসাধারণের সামগ্রিক কল্যাণের জন্য লোকশিক্ষকগণের আবির্ভাব ঘটে। সেরকমই সময় ছিল উনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধ। ১২৯৮ সনের (১৮৯১ খ্রীঃ) ৬ ফাল্গুন, এই দেবশিশুর আবির্ভাব হয় হুগলি জেলার ডুমুরদহ গ্রামে। পিতা প্রাণহরি চট্টোপাধ্যায় ছেলের নাম রেখেছিলেন প্রবোধচন্দ্র। মাতা মালাবতী দেবীর কোল আলো করে কৃষ্ণপঞ্চমী তিথিতে প্রবোধচন্দ্র জন্মানোর পর  সাধারণ আর পাঁচটা গ্রামের ছেলের মতই মানুষ হতে থাকেন ।


ছোট বেলা থেকেই পড়াশুনায় খুব আগ্রহ ছিল প্রবোধচন্দ্রের। অজানাকে জানতে চাওয়ার এক অদম্য ইচ্ছা প্রশ্নবাণ হয়ে তাঁর আশেপাশের লোকজনকে ব্যাতিব্যস্ত করে তুলত। কালক্রমে স্মৃতিভূষণ দাশরথি মুখোপাধ্যায়ের চতুষ্পাঠীতে শাস্ত্রের বিভিন্ন শাখায় পান্ডিত্য অর্জন করলেন প্রবোধচন্দ্র। শাস্ত্রের সাগরে অবগাহন করতে করতে যখন তিনি বিশ্ব-ব্রম্ভান্ডের সৃষ্টি রহস্য খুঁজে চলেছেন, তখন লোকান্তরিত হলেন পিতা প্রাণহরি। দিশহারা প্রবোধচন্দ্র তাঁর শিক্ষাগুরু ও সাধক দাশরথি মুখোপাধ্যায়ের কাছে প্রাণের শান্তির জন্য হাজির হলেন। অবশেষে ১৩১৯ সালের (১৯১২ খ্রীঃ) ২৯ পৌষ, মকর সংক্রান্তি তিথিতে গঙ্গা, যমুনা ও সরস্বতী নদীর সঙ্গমস্থল ত্রিবেনীতে সাধক দাশরথি প্রবোধকে ‘রামনাম’ মন্ত্রে দীক্ষা দিলেন। শিক্ষাগুরু হলেন দীক্ষাগুরু। প্রবোধচন্দ্রের নাম হলো ‘সীতারাম’।

সর্বক্ষণ রামনাম জপে মগ্ন থাকতেন প্রবোধচন্দ্র। রামনাম জপ করতে করতে  ডুবে যেতেন ভাবসাগরে তখন প্রবোধচন্দ্রের কানে ভেসে আসত ওঙ্কারধ্বনি। 

         হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ  কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে।              হরে রাম  হরে রাম রাম রাম  হরে হরে।



        সীতারাম মন্দির, ডুমুরদহ

লোকশ্রুতি, ধীরে ধীরে অলৌকিক শক্তির অধিকারী হয়ে উঠেছিলেন সীতারাম। তবে কোনদিনই উনি সেই শক্তির অপব্যবহার করেননি।  প্রেমময় ঠাকুর বলছিলেন, ” ঘরে বসেই নাম জপ করে সংসারটাকে আনন্দধামে পরিণত করো।” শুধু ধর্মের বাণী মুখে প্রচার করেই তিনি ক্ষান্ত থাকেন নি, সুদীর্ঘ সময় ধরে লিখে গিয়েছেন ১৫০ টির বেশি গ্রন্থ । সারা দেশে তিন শতাধিক আশ্রম, মঠ, মন্দির গড়ে উঠেছে আজ সীতারামের পদাঙ্ক অনুসরণ করে। 


সীতারামের আশ্রমের অনতিদূরে ডুমুরদহ গ্রামে গঙ্গা তীরে আরো একটি আশ্রম আছে। এই আশ্রম উত্তম আশ্রম নামে পরিচিত। আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা স্বামী উত্তমানন্দের নাম অনুসারেই আশ্রমের নামকরণ। গঙ্গা তীরে মনমুগ্ধকর শান্ত পরিবেশে এই আশ্রমটি ঠিক যেন তপবনস্বরূপ। এই আশ্রমের বর্তমান সর্বাধিস স্বামী অভয়ানন্দজী মহারাজ। 


                     উত্তম আশ্রম

                     ছবি সংগৃহিত


গুপ্তিপাড়া

গুপ্তিপাড়া হুগলী জেলার একটি প্রাচীন জনপদ। এই জায়গাটি চুঁচুড়া সদর মহকুমা ও বলাগড় থানার অধীন। গুপ্তিপাড়া ভাগীরথী নদীর তীরে অবস্থিত। ১৭৭৯ সালের রেনেলের মানচিত্রে দেখা যায় পার্শ্ববর্তী বেহুলা নদী গুপ্তিপাড়ার পাশ দিয়ে ভাগিরথী বা গঙ্গায় পড়েছে। ব্যান্ডেল স্টেশন থেকে গুপ্তিপাড়ার দূরত্ব ৪৩ কিমি। 


বাংলায় প্রথম বারোয়ারি পুজার প্রচলন শুরু হয়  গুপ্তিপাড়ায়। এটি বিন্ধ্যবাসিনী জগদ্ধাত্রী পুজা নামে প্রচলিত। ১৭৬০ সালে (মতান্তরে ১৭৯০) কয়েকজন ব্যক্তি স্থানীয় সেন রাজাদের প্রচলিত দুর্গাপুজায় অংশ না নিয়ে  নিজেরাই পুজা করার সিদ্ধান্ত নেয়। বারোজন ব্যক্তি মিলে প্রতিষ্ঠা করেন বিন্ধ্যবাসিনী বারোয়ারী পুজা। রাজার বিরুদ্ধে সেকালে এহেন সিদ্ধান্ত নেওয়া কিন্তু মুখের কথা নয়। রাজ পরিবারের লেঠেলের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সেই দুর্গাপূজা সারা রাজ্যে আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছিল। 


গুপ্তিপাড়া শিক্ষার বিষয়ে পিছিয়ে পড়া গ্রাম নয়। এই অঞ্চল বরাবরই শিক্ষা ও সংস্কৃতি অনুরাগের প্রতি বিশেষ যত্নশীল । একসময়ে এখানে প্রাচীন সংস্কৃত শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে নানা টোল গড়ে উঠেছিল। সংস্কৃত ভাষার শিক্ষাবিদ, টোলের পন্ডিতেরা বসবাস কর‍তেন এই গুপ্তিপাড়ায়। এই সংক্রান্ত বহু পুঁথি স্থানীয় সরকারী গ্রন্থাগার 'শিশির বানী মন্দির পাঠাগারে' আজও সংরক্ষিত আছে। বর্তমানে এই অঞ্চলে অনেকগুলি প্রাথমিক ও উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় আছে। গুপ্তিপাড়ায় আছে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ IIMT । রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থী আসেন এই কলেজে পড়াশুনা করতে। গুপ্তিপাড়ার পরের স্টেশন অম্বিকা কালনা। এই এলাকার বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রী কালনা মহাবিদ্যালয় ও জিরাট মহাবিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি শিক্ষা লাভ করেন। 


গুপ্তিপাড়া হুগলি জেলার প্রান্তবর্তী গ্রাম। গুপ্তিপাড়ার পরই পূর্ব বর্ধমান জেলার সীমানা। আবার গঙ্গার অন্যপাড়ে নদীয়া জেলার ফুলিয়া। ফলে এই গ্রামের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিকাশের মধ্যে তিন জেলার প্রভাব লক্ষ্যনীয়। গুপ্তিপাড়ার প্রধান ও বিখ্যাত উৎসব হল দোল ও রথযাত্রা। এই অঞ্চলে ২৭৯ বছরের প্রাচীন বৃন্দাবনচন্দ্রের রথযাত্রা শুরু হয় রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সময়ে। বৃন্দাবন মঠের সামনে থেকে বাজার পর্যন্ত দীর্ঘ এক মাইল পথের দু’ ধারে মেলা বসে। উল্টোরথের আগের দিন ‘ভাণ্ডারলুট’ উৎসব ধুমধামের সাথে পালিত হয়। প্রথা অনুযায়ী ভোগ নিবেদন করার পর ভক্তরা ভোগ লুট করে নেন। বাংলার ঐতিহ্যশালী ও বড় রথগুলির মধ্যে গুপ্তিপাড়ার রথ অন্যতম। পূর্বভারতের নানা অঞ্চল থেকে রথের রশি টানার জন্যে এখানে মানুষ আসেন।


                 বৃন্দাবনচন্দ্র মন্দির

বৃন্দাবনচন্দ্র মঠে রয়েছে ৪টি বৈষ্ণব মন্দির। বৃন্দাবনচন্দ্র, চৈতন্য, রামচন্দ্র এবং কৃষ্ণচন্দ্রের মন্দির। রামচন্দ্র মন্দিরে বাংলার টেরাকোটা স্থাপত্যের নিদর্শন আছে। এই চার মন্দিরের সমষ্টিকে বলা হয় গুপ্তিপাড়ার মঠ। গুপ্তিপাড়া ও পার্শ্ববর্তী কালনা বৈষ্ণব সংস্কৃতি ও শাক্ত সংস্কৃতির দ্বারা প্রভাবিত। প্রাচীন দেশকালী মাতার মন্দির আছে গুপ্তিপাড়ায় । দেশকালীমাতা গুপ্তিপাড়ার অধিষ্ঠাত্রী দেবী। এখানে কালীপূজার দিন নতুন মাটির মূর্তি এনে পুজো করা হয়। পরের শুক্লা দ্বিতীয়ার দিন মূর্তির কেশ, কাঁকন, কেউর, কপোল প্রভৃতি কেটে নিয়ে বাকি মূর্তি গঙ্গায় বিসর্জন দেওয়া হয়। খণ্ডিত অংশগুলো একটা আধারে রেখে সারা বছর তান্ত্রিক মতে পূজা করা হয়। এই মন্দিরে আধার ছাড়া কোনো দেবীমূর্তি নেই।


গুপ্তিপাড়ায় জন্মেছেন রাজা রামমোহন রায়ের সঙ্গীত শিক্ষাগুরু কালী মির্জা। এছাড়া বিখ্যাত কবিয়াল ভোলা ময়রা, বিজ্ঞানী ইন্দুমাধব মল্লিক ও নবাব সিরাজউদ্দৌলার সেনাপতি মোহন লালের জন্মস্থান হিসেবেও স্বীকৃত। বাংলার মিষ্টান্ন গুঁপো সন্দেশ উদ্ভব হয় গুপ্তিপাড়াতে।



অম্বিকা কালনা


অবিভক্ত বর্ধমান জেলার প্রাচীন জনপদ অম্বিকা কালনা। অধুনা পূর্ব বর্ধমানের এই শহর কালনা নামেও পরিচিত । অতীতে এই জনপদের নাম ছিল অম্বুয়া নগরী। আকবরের রচিত আইন-ই- আকবরি তেও এই অম্বুয়া নগরীর উল্লেখ আছে।  কথিত আছে ঋষি অম্বু এই কালনা শহরেই বসবাস করতেন। তাঁরই নাম অনুসারে শহরের নাম অম্বিকা কালনা। দ্বিমতে কালনার অধিষ্ঠাত্রি দেবী অম্বিকার নাম অনুসারে কালনা, অম্বিকা কালনা নামে পরিচিত। কালনা শহরের শিক্ষা ও সংস্কৃতির চর্চা বহুকাল থেকেই খ্যাতি অর্জন করেছে । শহরের প্রানকেন্দ্রে একটি মহাবিদ্যালয় ও নয়টি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, একটি টেকনিক্যাল কলেজ  আছে।

 

বিভিন্ন ধর্মের মানুষ এই কালনা শহরে বসবাস করেন। কালনা শহরের উত্তরে ভাগিরথী নদী। বর্নিত আছে কালনা কোন এক সময় এরাজ্যের অন্যতম প্রধান জাহাজ বন্দর ছিল। আজও কালনা ব্যাবসা বাণিজ্যে অন্যতম প্রধান জায়গা দখল করে আছে পূর্ব বর্ধমান জেলায়।


           ১০৮ শিব মন্দির, কালনা


 কালনার মূল আকর্ষণ দুইটি বৃত্তের মধ্যে সুদৃশ্য ১০৮ শিব মন্দির । এই মন্দির স্থানীয়দের কাছে নব কৈলাশ মন্দির নামেই পরিচিত। ১৮০৯ সালে মহারাজ তেজচন্দ্র বাহাদুর এই ইঁটের তৈরি আটচালা মন্দিরগুলি নির্মাণ করেন। মন্দিরগুলি দুটি বৃত্তের আকারে বিন্যস্ত। একটি বৃত্তে ৭৪টি ও অপর বৃত্তে ৩৪টি মন্দির অবস্থান করছে। প্রথমোক্ত বৃত্তের মন্দিরগুলিতে প্রতিষ্ঠিত শিবলিঙ্গগুলি শ্বেত অথবা কষ্টিপাথরে ; কিন্তু শেষোক্ত বৃত্তের মন্দিরগুলিতে প্রতিষ্ঠিত শিবলিঙ্গগুলি কেবলমাত্র শ্বেত পাথরেই নির্মিত। মন্দিরের সুপরিকল্পিত নকশার কারণে সবকটি শিবলিঙ্গই মন্দির-চত্বরের কেন্দ্র থেকে দেখা যায়। সম্ভবত জপমালার প্রতীক হিসেবে মন্দিরগুলি উপস্থাপিত হয়েছে।


১৭৫১-৫২ সালে প্রতিষ্ঠিত ২৫টি চূড়বিশিষ্ট কৃষ্ণচন্দ্র মন্দির কালনার অপর জনপ্রিয় দ্রষ্টব্য। এই জমকালো ইঁটের তৈরি পঞ্চ-বিংশতি রত্ন মন্দিরটির সামনে সংলগ্ন রয়েছে অপূর্ব অলঙ্করণে সমৃদ্ধ ত্রিখিলান প্রবেশ পথ বিশিষ্ট ঢালা ছাদের প্রলম্বিত বারান্দা। মন্দিরের গা অলঙ্কৃত মহাকাব্য ও পুরাণের বিভিন্ন দৃশ্যসম্বলিত পোড়ামাটির ফলকে সমৃদ্ধ। এছাড়াও ১৭৩৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ২৫টি চূড়াবিশিষ্ট অপর মন্দির লালজি মন্দির এবং ১৮৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত রেখ দেউলের নিদর্শন প্রতাপেশ্বর মন্দিরও উল্লেখযোগ্য। প্রাচীরবেষ্টিত প্রাঙ্গনে ১৭৩৯ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত এই পঞ্চবিংশতি-রত্ন লালজি মন্দির সম শ্রেণীভুক্ত মন্দিরগুলির মধ্যে প্রাচীনতম। মন্দিরের সামনে রয়েছে একটি নাটমণ্ডপ এবং আর একটি পর্বতাকৃতি মন্দির যা গিরিগোবর্ধন নামে পরিচিত। মূল মন্দিরটি পোড়ামাটির অলঙ্করণে মণ্ডিত। এই ছবিতে কিছু পোড়ামাটির কাজের নমুনা দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে উঁচু ভিত্তির উপর উত্থিত এক খিলান প্রবেশ পথ ও ঈষৎ বক্র শিখর সমন্বিত প্রতাপেশ্বর মন্দিরটি ঊনবিংশ শতকের রেখ দেউলের একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। মন্দিরের গায়ে রয়েছে পোড়ামাটির জমকালো অলঙ্করণ। মন্দিরের কাছেই রয়েছে একটি ছাদবিহীন রাসমঞ্চ।মাইজির বাড়ি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৭৫২ সালে। এই বাড়িতেই প্রতিষ্ঠিত শ্যামচাঁদ রাধারানি মন্দির। এ বাড়ির ঐতিহ্য তিনশো বছরেরও বেশি পুরনো। আজও দোল পূর্ণিমা, রথযাত্রা, ঝুলন পূর্ণিমা, অন্নকূট ও রাস বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনায় পালিত হয় এখানে। এই উপলক্ষে এখানে উপস্থিতও হন বর্ণ, ধর্ম, জাতি নির্বিশেষে সমাজের সকল স্তরের মানুষ। তাছাড়া প্রতিবৎসর রাজ্য সরকারের পক্ষ্য স্থানীয় রাজবাড়ীর মাঠে পর্যটন উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিদিন সন্ধ্যায় পৌরসভার উদ্যোগে মন্দিরগুলিতে রঙবেরঙের আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা হয়েছে। 



         প্রতাপেশ্বর মন্দির ও রাস মন্দির

 রাজবাড়ীর অনতিদূরে গোপাল বাড়ির ২৫ চূঁড়া বিশিষ্ট মন্দিরটিও পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয়। 

গোপালবাড়ির সন্নিকটে অবস্থিত কালনার অধিষ্ঠাত্রীদেবী মা সিদ্ধেশ্বরীর এক চালা মন্দির ।

১১৪৬ বঙ্গাব্দের ২৬ জ্যৈষ্ঠ মাসে  রাজা চিত্রসেনের ইচ্ছায় এই মন্দির তৈরি হয়েছিল। মন্দির নির্মাণ করেছিলেন সেকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পী শ্রীরামচন্দ্র মিস্ত্রি। বর্তমান মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা চিত্রসেন হলেও তার বহুপূর্ব থেকেই দেবী সিদ্ধেশ্বরী কালনায় পূজিত হয়ে আসছেন। অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন আসলে দেবী সিদ্ধেশ্বরী জৈনদের আরাধ্য দেবী। দেবী সিদ্ধেশ্বরীর মূল মন্দিরটি ছাড়াও আরো পাঁচটি শিবমন্দির আছে  মন্দির প্রাঙ্গণে। এর একটি ১৭৬৪ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠা করেন রাজা ত্রিলোকচাঁদের মাতা লক্ষীকুমারী দেবী। বর্ধমান রাজার অমাত্য ছিলেন রামচন্দ্র নাগ। ১৭৪৭ খ্রিষ্টাব্দে তিনিও অন্য একটি শিবমন্দির নির্মাণ করেন মন্দির প্রাঙ্গনে। 


                 মা সিদ্ধেশ্বরী

সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরের অনতি দূরেই অনন্তবাসুদেব মন্দির। এটিও বিষ্ণুপুরের স্থাপত্যের আদলে তৈরি আটচালা আকৃতির মন্দির। টেরাকোটার অপূর্ব অলঙ্করণে সুসজ্জিত এই মন্দির। গর্ভগৃহে প্রতিষ্ঠিত পাথরে নির্মিত বদ্রিনারায়ণের সুদর্শন বিগ্রহ। ১৭৫৪ খ্রিস্টাব্দে (১৬৭৬ শকাব্দ) মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন রাজা ত্রিলোকচাঁদ। উৎসর্গ করেন পিতামহী ব্রজকিশোরী দেবীর নামে। 


গঙ্গার তীরে বর্ধমান মহারাজাদের তৈরি আরো একটি সুন্দর মন্দির আছে, এটি জগন্নাথ মন্দির নামে পরিচিত। তবে সেই মন্দিরটি রক্ষনাবেক্ষনের অভাবে দিন দিন ধ্বংসপ্রাপ্ত হচ্ছে। এক সময় রাজাদের উদ্যোগে কালনায় জগন্নাথ মন্দিরের রথযাত্রা উৎসবে দূরদূরান্ত থেকে অনেক মানুষ আসতেন। হত নগরপরিক্রমা, উৎসব। কিন্তু আজ সেই কৌলিন্য হারিয়েছে সময়ের সাথে সাথে। রাজাও নেই,তাই রাজ বৈভবও দেখা মেলে না জগন্নাথ মন্দিরে । যদিও রথযাত্রা উৎসব এখনো হয়, কিন্তু সেই চাকচিক্য ছাড়াই।


কালনা শহর সাধক কমলাকান্তের সাধনক্ষেত্র। কালনার বিদ্যবাগিস পাড়ায় কমলাকান্তের ভিটায় নবরূপে একটি মন্দির তৈরি করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সাধক ভগবান দাস বাবাজি একজন বৈষ্ণব সাধক ছিলেন। বৃন্দাবন থেকে তিনি কালনায় এসে বসবাস করতেন। একসময় ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণদেব ভগবান দাস বাবাজিকে দর্শন করতে কালনায় উপস্থিত হয়েছিলেন। কালনা চকবাজারে ভগবান দাস বাবাজির মন্দির। ভগবান দাস বাবাজি রোজ গঙ্গায় স্নান করতেন। কিন্তু বার্ধক্যে তিনি গঙ্গায় যেতে পারতেন না। সেই সময় মা গঙ্গা তার আশ্রমে এসেছিলেন। এই মন্দিরে আজও মা গঙ্গা নিত্য দর্শন দেন । এটি পাতাল গঙ্গা মন্দির নামেও পরিচিত। 


কালনা  বৈষ্ণব সাধনার অন্যতম পীঠস্থান। এখানে নিমাই সন্নাসী, নিত্যানন্দ, গদাধর পন্ডিত বারেবারে এসেছেন ও থেকেছেন। কালনার মহাপ্রভু বাড়ি দর্শনার্থীদের অন্যতম আকর্ষণ । এখানে আজও ঝাঁপি দর্শন প্রথা চালু আছে। শ্রী চৈতন্যদেব যে আমলি বৃক্ষের তলায় বিশ্রাম নিয়েছিলেন তা আজও অক্ষত ও বিরাজমান। এই মন্দিরে  রক্ষিত আছে চৈতন্যদেবের পাণ্ডুলিপি ও ব্যবহৃত সামগ্রী। এই মন্দিরে সকাল ১০ টার মধ্যে পূজারীকে আবেদন করলে দর্শনার্থীদের জন্য ভোগের ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে।  


মহাপ্রভু মন্দিরের কাছেই কালনার  শিতলা তলায় প্রাচীন একটি মসজিদ আছে, যা কালনার পুরাতন মসজিদ নামে পরিচিত। এই মসজিদটি তৈরি হয়েছিল আনুমানিক ১৫৩৩ খ্রিস্টাব্দে। মুঘল আমলে হুসেন শাহের পুত্র ফিরোজ শাহের চেষ্টায় তাঁর সেনাপতি আলাউদ্দিন শাহ এই মসজিদটি তৈরি করেছিলেন। এত পুরানো মসজিদ পূর্ব বর্ধমান জেলায় নেই। ঈদের সময় এবং বিশেষ বিশেষ পরবে মুসলিম ধর্মাবলম্বী মানুষেরা এই মন্দিরে নামাজ পড়েন। 


প্রথমেই বলেছিলাম কালনা প্রাচীন জনপদ। এই জনপদ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বিদ্যাসাগর, নেতাজী সুভাষচন্দ্রের পদার্পনে ধন্য । কালনার কৃতি সন্তান তারানাথ তর্কবাচস্পতীর পাঠশালা ও বসতবাটী ছিল এশহরে। যাঁরা বিদ্যাসাগরের নাম জানেন তাঁরা তারানাথ তর্ক বাচস্পতি মহাশয়ের মত পন্ডিতের নামও জানেন। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে এই শহরের অনেক সংগ্রামী মানুষ  অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন। সাধক ভবা পাগলা এ শহরে শাক্ত আরাধনা করেছেন। ভ্রমনার্থীরা ইচ্ছা করলে একদিনেই এসব দেখে নিতে পারেন। দেখে নেওয়া যায় একটি দিন কালনায় থাকলে কালনা থেকে মাত্র ৫ কিমি দূরে স্বামী বিবেকানন্দের পৈতৃক ভিটে দত্ত দেরিয়াটন। যদিও সেই বাড়ির আর কিছুই নেই। 



                  ভবার বাড়ি

কালনা মহকুমার বৈদ্যপুর গ্রামের নামও ভ্রমণপিপাসু মানুষের কাছে আজ আর অজানা নয়। একসময় এই গ্রামে নন্দীদের জমিদারি ছিল। নন্দী বংশের প্রথম জমিদার হারাধন নন্দী। একদিন কালনায় থাকলে বৈদ্যপুরের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য পুরাকীর্তিগুলিকেও দেখে নেওয়া যায়। জোড়া দেউল, বৃন্দাবন চন্দ্র মন্দির, রাজ রাজেশ্বরী মন্দির, নবরত্ন মন্দির, রাশ মঞ্চ ও জমিদার বাড়ি বৈদ্যপুরের অন্যতম দর্শনীয় স্থান। বৈদ্যপুরের প্রধান উৎসব রথ যাত্রা ও জগদ্ধাত্রি পূজা। বেশ আড়ম্বরের সাথে এই দুই উৎসব এই গ্রামে পালিত হয়। 


বৈদ্যপুর রথতলা পেরিয়ে বৈদ্যপুর স্কুলের মাঠ। এই মাঠের পশ্চিম দিকের পথ চলে যাচ্ছে গোপালদাসপুর গ্রামে। এখানে আছেন “রাখাল রাজা”মন্দির।  বৈদ্যপুর অঞ্চলের মন্দিরগুলি সঠিক রক্ষনাবেক্ষনের কারনে অনেকগুলিই তাঁর প্রাচীন গরিমা হারালেও এই অঞ্চল আজও ভক্তি আন্দোলনের ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। স্থানীয় মানুষদের কাছে রাখাল রাজা এক আবেগ। 


রাখাল রাজার ইতিহাস বড়ই রোমাঞ্চকর। কাটোয়ার খাটুন্তি গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন ধর্মপ্রাণ রামকানু গোঁসাই। পারিবারিক কলহে অতিষ্ট হয়ে তিনি তাঁর আরাধ্য দেবতা গোপীনাথকে সঙ্গে নিয়ে সপরিবারে গোপালদাসপুর জঙ্গলে এসে বসবাস করতে শুরু করেন। সেই সময় এই এলাকা ছিল গভীর জঙ্গলে পরিবেষ্টিত। আশেপাশের মানুষজন খুব একটা দরকার না পড়লে এই জঙ্গলে আসতেন না।মাধুকরি করেই সেকালে রামকানু জীবিকা অর্জন করতেন ও দেবতার সেবা করতেন। তাঁর তিন পুত্র সন্তান ছিল। নিমাই চাঁদ, বলদেব ও রাখাল। এই রাখাল একদিন খেলতে খেলতে পিতার লাগানো মাধবী গাছটির ডাল পালা সব ভেঙে ফেলে। এদিকে অন্যান্য ফুলের গাছগুলিতেও কোন ফুল ধরেনি সেদিন।রামকানু সবাইকে জিজ্ঞাসা করলেন কে মাধবী গাছটির ফুল ছিঁড়েছে। সবাই পিতার ভয়ে নিশ্চুপ ।রামকানু রেগে গেলেন, পূজার ফুল না পেয়ে ক্রোধে বলে বসলেন, যে ফুল ছিঁড়েছে তিন রাত্রির মধ্যে তাঁর মৃত্যু হবে।


পিতার অভিশাপে রাখালের মৃত্যু হয় তারপর দিনই। রামকানু পরে জানতে পেরে অবশ্য দেবতার সামনে কান্নাকাটি করেও পুত্র রাখালের মৃত্যু রোধ করতে পারেন নি। রাখালের মৃত্যুর পর ব্রাহ্মন দুঃখে বৃন্দাবনের দিকে হাঁটতে থাকেন। একদিন সন্ধ্যায় একটি গাছের তলায় বিশ্রাম নেবার সময়, তিনি স্বপ্নাদেশ পান বৃন্দাবন তো তাঁর গ্রামেই। ভগবান রামকানু গোস্বামীকে গ্রামে ফিরতে বলেন। ব্রজধামে না গিয়ে গ্রামে ফিরে এসে রাখাল রাজের প্রতিষ্ঠা  ও পূজা শুরু করেন রামকানু গোস্বামী। 


স্বপ্নাদেশে রাখাল রাজের মূর্তি প্রতিষ্ঠিত করেন। এখানে বর্তমানে যে মূর্তি পূজিত হয় রাখাল রাজের তা বড়ই সুন্দর। কৃষ্ণ রাখাল, বাম হাতে ক্ষীরের নাড়ু, ডান হাতে লাঠি। মূর্তির ডান হাঁটু ভাঙা। রাখাল রাজার চারিদিকে গাভী ধবলী। কথিত আছে যে নিমকাঠটি দিয়ে মূর্তিটি তৈরি হয়েছিল তা পাশের পুকুরে ভেসে উঠেছিল। এই পুকুরটি যমুনা নামে খ্যাত। স্বপ্নাদেশে রামকানু নির্দেশমত সেই কাঠটি দিয়ে দেবতার মূর্তি বানিয়েছিলেন বাঘনাপাড়া গ্রামের পাঁচ বছরের শিশু মহাদেব।এসবই লোককথা বা স্থানীয় মানুষের ও ভক্তদের  বিশ্বাস।


শত শত বৎসর ধরে এই এলাকায় আসছেন সাধুসন্ন্যাসী, তীর্থযাত্রী  ও ভ্রমন পিপাসু মানুষেরা। সীতারাম ভক্ত ব্রহ্মানন্দ দাস সহ অজানা অচেনা অনেক সাধু সন্ত এখানে এসেছেন। একসময় গভীর জঙ্গলের মধ্যেই এই মন্দির গড়ে তুলেছিলেন পোঁটবার জমিদার গোপাল দাস। যদিও ওনার জীবনী বিশদে জানতে পারিনি। তবে সে সময় মুর্শিদাবাদের নবাব ছিলেন মুর্শিদকুলি খান। রামকানু গোস্বামীর কথা শুনে নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ ও নিষ্কর জমি দান করেছিলেন রাখাল রাজের সেবার জন্য। 


জনশ্রুতি পোঁটবার  জমিদার গোপাল দাস শিকারে বেরিয়ে এই এলাকার গভীর জঙ্গলে একদিন সন্ধ্যায় তাঁবু ফেলেন। এমনি সময় তিনি জঙ্গলে কাঁসর, ঘন্টা, শঙ্খ ধ্বনি শোনেন। সেই আওয়াজ অনুসরণ করতে করতে তিনি একটি বাড়িতে এসে উপস্থিত হয়ে দেখেন একজন ব্রাহ্মন কৃষ্ণের পূজা করছেন। গভীর জঙ্গলে এ দৃশ্য দেখে তিনি অবাক হন। এদিকে ব্রাহ্মন গোপাল দাসকে দেখেও অবাক। তিনি প্রশ্ন করেন গোপালের এখানে আসার হেতু। এরপর ব্রাহ্মন তাঁদের সকলকেই ভোগ খাবার অনুরোধ করেন। কিন্তু অল্প ভোগ থাকলেও সেদিন জমিদার ও তাঁর সহযাত্রী সকলের সেদিন পেট ভরে। জনশ্রুতি এই গোপাল দাস প্রথম এখানে মন্দির করেন ও রাখাল রাজের ভোগের জন্য সম্পত্তি দান করেন ব্রাহ্মনকে। ১৭৭৫ সালে এই মন্দির তৈরি হয়। অন্যান্য মন্দিরগুলি যদিও ধ্বংস হয়েছে। এই গোপাল দাসের নাম অনুসারেই গ্রামের নাম গোপালদাসপুর। 


মন্দির প্রাঙ্গণ খুবই সুন্দর। ফাঁকা মাঠের মধ্যে বড় বড় বট, অশল্থ, করবীর জঙ্গল আজও চোখে পড়ে। মন্দিরের পাশেই যমুনা নামের পুষ্করিনি,যা পবিত্রতার নিদর্শন। অনতি দূরেই বয়ে চলেছে একটি খাল। পঞ্চায়েতের পরিচর্যায় অনেক বৃক্ষ রোপিত হয়েছে চারিপাশে। মন্দিরের আশেপাশে কোন ঘরবাড়ি নেই। এ যেন এক তপোবন।


মন্দিরে আসার জন্য বর্তমানে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হলেও তা যথেষ্ট নয়। গ্রামের পাকা রাস্তা হইতে মন্দির পর্যন্ত রাস্তার উন্নতি হলে ভালো হয়। তবে এ রাস্তায় ছায়াঘন পরিবেশ দূর দুরন্ত থেকে আসা পর্যটকদের মুগ্ধ করে। 


বংশপরম্পরায় রামকানু গোঁসাই এর পরিবারের লোকজনই এখানে পৌরহিত্য করেন। যদিও এখন পালা করে পূজাপাঠ অনুষ্ঠিত হয়। ভাত, ডাল, শুক্ত, চরচরি,চাটনি, পরমান্য সহযোগে রোজ দুপুরে ভোগ দেওয়া হয়। এখানে এলে প্রসাদ না পেয়ে কেউই ফিরে যায় না। এটাই এখানকার স্থান মাহাত্ম। তবে এখন পঁচিশ টাকা করে মূল্য দিতে হয়। পূজারীরাই ভোগের ব্যবস্থা করেন। প্রতিদিন কীর্তন অনুষ্ঠিত হয়। মন্দির সংলগ্ন প্রশস্ত মাঠটি বিশেষ সুন্দর।

সন্ধ্যা আরতির পর মন্দিরের দরজা বন্ধ হয়। জনশ্রুতি আরতির পরে এই স্থানে আর কেউ আসেন না। কারন পুরো এলাকাতেই এক অলৌকিক পরিবেশ সৃষ্টি হয়। মানুষের বিশ্বাস ভগবান রাখালরাজা এই স্থানে সাক্ষাৎ বিরাজ করেন সন্ধ্যার পর। এক পুরোহিত কে এই ঘটনার সত্যতা জানতে চাইলে উনি বলেন- “কিছু মানুষ এসেছিলেন রাত্রে বিষয়টির সত্যতার প্রমান পাওয়ার জন্য। বেশির ভাগ জনই ভয়ে ফিরে গেছেন। আবার অনেকের অপমৃত্যু হয়েছে ,নয়তো মুক ও বধির হয়ে গেছেন ।” পাঁচালিকার অজিত কুমার গোস্বামীর লেখা বই থেকেও সে ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায়।


তবে বর্তমানে যোগাযোগ ব্যবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। তাই এই তীর্থভূমিতে জনসমাগম দিন দিন বাড়ছে। বর্ধমান -হাওড়া মেন লাইন ট্রেন ধরে বৈচি স্টেশনে বা হাওড়া-কাটোয়া লোকাল ধরে কালনা স্টেশনে নেমে বাসে আসতে হয় বৈদ্যপুর। বৈদ্যপুর থেকে অটো বা টোটো রিক্সা নিয়ে গোপালদাসপুর আসা সুবিধা। গোপালদাসপুর আসার পথেই পড়বে আরও একটি প্রাচীন মন্দির “জগৎ গৌরী” মায়ের। এই স্থান জগৎ গৌরী তলা নামে খ্যাত।বিখ্যাত তান্ত্রিক সাধক দুর্গদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এখানেই তান্ত্রিক সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেছিলেন। 


কালনায় এসে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই দেখে নিতে পারেন আরো দুটি প্রসিদ্ধ গ্রাম বাঘনাপাড়া ও সমুদ্রগড়। শিবক্ষেত্র রূপেই আদি পরিচিতি বাঘনাপাড়ার। তবে বৈষ্ণবধর্মের প্রভাবে একসময় ধীরে ধীরে সে পরিচিত ম্লান হয়ে প্রসিদ্ধি পায় বৈষ্ণবধর্মের কেন্দ্র রূপে। স্থানীয় বৈষ্ণব পরিবারের উদার মানসিকতায় শিব দুর্গা কালী জগদ্ধাত্রী রাধাকৃষ্ণ প্রভৃতি দেবদেবীর পুজো চলে আসছে দীর্ঘকাল ধরে এই গ্রামে । সারা বছর উৎসব লেগে রয়েছে এখানে। শিবরাত্রিতে গোপীশ্বর মন্দিরে, বৈশাখী পূর্ণিমায় কৃষ্ণ বলরামের ফুলদোল উৎসব, দোলযাত্রা, চৈত্রমাসে গোপীশ্বর শিবের গাজন, আষাঢ়ে জগন্নাথদেবের স্নান ও রথযাত্রা এমন অসংখ্য উৎসবে সারাবছরই মুখরিত বাঘনাপাড়া। কালনা শহর থেকে বাঘনাপাড়ার দূরত্ব মাত্র ৭ কিমি। বাসের যোগাযোগ ভালো। ইচ্ছা হলে একটি টোটো বা অটো রিকশা ভাড়া করেও দেখে নেওয়া যায় এই গ্রামের অনাচেকানাচে । 


সমুদ্রগড় আরো একটি জনপদ। কালনা থেকে দূরত্ব মাত্র ১৭ কিমি। তাঁত শিল্পের জন্য বিশেষ বিখ্যাত এই জনপদ। ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্র হিসাবে  এই গ্রাম বিশেষ পরিচিত রাজয়বাসীর কাছে। 


নবদ্বীপ


            

                 প্রাচীন মায়াপুরে

চলুন কালনার চারটি স্টেশন পরে নবদ্বীপ ধাম ঘুরে নিই। ব্যান্ডেল থেকে রেলপথ ধরে কাটোয়া লোকালে মাত্র দেড় ঘন্টায়  পৌঁছে যাবেন নদীয়া জেলার এই জনপদে। নবদ্বীপের নাম শোনেননি এমন মানুষ এদেশে নেই বললেই চলে। নবদ্বীপ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের নদিয়া জেলার একটি সুপ্রাচীন শহর । নবদ্বীপ চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মস্থান ও লীলাক্ষেত্র । বাংলায় সেন রাজাদের আমলে (১১৫৯ - ১২০৬) নবদ্বীপ ছিল বাংলার রাজধানী। ১২০২ সালে রাজা লক্ষ্মণ সেনের সময় বখতিয়ার খলজি নবদ্বীপ জয় করেন ও   বাংলায় মুসলিম সাম্রাজ্যের সূচনা করেন। নবদ্বীপ ছিল সেই সময়ে বিদ্যালাভের পীঠস্থান ও একে বলা হত বাংলার অক্সফোর্ড।


এই জনপদ ধন্য হয়েছে শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু, রঘুনন্দন, কৃষ্ণচন্দ্র আগমবাগিস, ধোয়ী, উমাপতি, বিষ্ণুপ্রিয়া, প্রসন্ন চন্দ্র ন্যায়রত্ন ও প্রসন্ন চন্দ্র তর্ক রত্নের মত দিকপালদের জন্মগ্রহণের মধ্য দিয়ে। বরাবরই এই শহর শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশের অন্যতম পীঠস্থান। একসময় চৈতন্যের আবির্ভাবের পর কৃষ্ণ ভাবপ্রচারে এই শহর সারা দেশে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেছে। অনেকে এই শহরকে বাংলার বৃন্দাবন বলেন। এই শহরকে কেন্দ্র করে অসংখ্য মঠ ও মন্দির গড়ে উঠেছে। এই কারনেই দেশবিদেশের হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষ ভিড় করেন এই শহরে। গঙ্গা নদীর ওপর পারে মায়াপুরে ISKON এর মন্দির এই শহরের আরো এক আকর্ষণ। 


নবদ্বীপের দর্শনীয় স্থানগুলির মধ্যে অন্যতম দর্শনীয় স্থান  বুড়োশিব মন্দির। এটি দ্বিশতাধিক কালের প্রাচীন শিব মন্দির। বাংলার মন্দির স্থাপত্য রীতির নবরত্ন ধারায় মন্দিরটি নির্মিত হয়েছে। মন্দিরটি দ্বিশতাধিক প্রাচীন হলেও শিব মূর্তিটি আরো বেশি প্রাচীনত্বের স্মৃতি বহন করছে। বুড়োশিবের আদি প্রাচীন মন্দিরটি কৃষ্ণকান্ত শিরোমণি ১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দের পূর্বে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পরে ১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দে তারাপ্রসন্ন চূড়ামণির প্রচেষ্টায় বর্তমান "নবরত্ন' মন্দিরটি নির্মিত হয় ।  নবদ্বীপের জনৈক প্রবীণ নাগরিকের কাছ থেকে জানি মন্দিরের বারান্দা এবং চূড়াগুলির নির্মাণ ১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দে হলেও গর্ভগৃহটি প্রাচীন, পাতলা টালি ইটের নির্মিত।

একসময় পোড়ামাতলায় হত শিবের বিয়ে। বাসন্তীপুজোর দশমীর ভোরে বুড়োশিব আর যোগনাথ শিবের জোড়া বিয়ে হত। বিয়েতে স্ত্রী আচার, জলসাধা থেকে কোঁচানো ধুতি পরে বরযাত্রী যাওয়া কিংবা মালাবদল, কোনও কিছুই বাদ যেত না। তারপর চলত ঢালাও ভুরিভোজ।


ভবতারণ শিব মন্দির নবদ্বীপ শহরের দ্বিশতাধিক প্রাচীন একটি শিব মন্দির। নবদ্বীপের পোড়ামাতলায় এই মন্দিরের পাশেই পোড়ামা কালী মন্দির ও মা ভবতারিণী মন্দির অবস্থিত। ভবতারণ মন্দিরটি বিরলরীতির অষ্টকোনাকৃতি শিখর মন্দির। নবদ্বীপে গৌরীপট্ট সম্বলিত ব্রাহ্মণ্য-সংস্কৃতির প্রথম শিব মূর্তিটি ১৬৮৩ থেকে ১৬৯৪ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রাজা রুদ্র রায় স্থাপন করেছিলেন। রাজা রাঘব গণেশ মূর্তি স্থাপনের সঙ্গে একটি শিবলিঙ্গও সেই সময়েই স্থাপন করেন। তখন সেটি রাঘবেশ্বর শিব নামে পরিচিত ছিল। কিন্তু ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দের গঙ্গার ভাঙনে এই মন্দিরসহ মূর্তিটি গঙ্গাগর্ভে নিমজ্জিত হয়। তার প্রায় ৬৫ বছর পর রাজা গিরিশচন্দ্র ১৮২৫ খ্রিস্টাব্দে পোড়ামাতলায় শিব মূর্তিটি ভবতারণ মানে পুন:স্থাপিত করেন, যা বর্তমানে ভবতারণ শিব মানে পরিচিত। নবদ্বীপ বাজারের অভ্যন্তরে এই পোড়া মা তলা ও তথায় বহুপ্রাচীন বটগাছটি দর্শনার্থীদের কাছে বিস্ময়ের। পোড়া মা এই বটগাছটির বহু শিকড়ের তলায় অধিষ্ঠিত। পঞ্চদশ শতাব্দীতে বাসুদেব সার্বভৌম নামক এক পণ্ডিত নবদ্বীপ শহরের এক বটবৃক্ষতলে দক্ষিণাকালীর ঘট স্থাপন করেন। কোন এক সময়ে বটগাছটি অগ্নিদগ্ধ হলে এই কালী পোড়ামা নামে জনপ্রিয় হন।


                  পোড়ামা মন্দির

অন্য মতে, বাসুদেব সার্বভৌম এর বহু পূর্বে জনৈক রামভদ্র সিদ্ধান্তবাগীশ (কুসুমাঞ্জলি গ্রন্থের 'রামভদ্রি' টীকাকার) দক্ষিণাকালীর সাধক ছিলেন। গোপাল মন্ত্রে সিদ্ধ অন্য এক পণ্ডিতের সঙ্গে তার শাস্ত্রীয় বিচার হয়। পরাজিত ব্যক্তি বিজয়ীর মন্ত্রশিষ্য হবেন, উভয়ে এই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন। সিদ্ধান্তবাগীশ, পরাজিত হয়ে প্রতিজ্ঞামতো তার ইষ্টমন্ত্র ত্যাগ করতে উদ্যত হলে, ভয়ানক অগ্নিকাণ্ডে তার ইটের বাড়ি ভস্মীভূত হতে থাকে এবং মন্দিরের মধ্যে দেবীর করালমূর্তি তার দর্শনগোচর হয়, দেবীর কোলে গোপাল উপবিষ্ট। মন্ত্রশোধিত জল ছড়িয়ে আগুন নিভলে সাধক নিজে বেঁচে যান এবং তার মন্দিরে দু'খানি মাত্র ইট অবশিষ্ট থাকে। এই ইট দুখানা আজও পোড়া-মার আধার হয়ে রয়েছে এবং তার উপরেই ঘটস্থাপন করে পূজা হয়।


নবদ্বীপে যাবেন আর সোনার গৌরাঙ্গ মন্দির দর্শন করবেন না এমন হয় না। অসংখ্য মন্দির নবদ্বীপে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। প্রায় দেড় শতাধিক মন্দির গড়ে উঠেছে নবদ্বীপ শহরে। তার মধ্যে সোনার গৌরাঙ্গ মন্দির অবশ্যই দেখুন।বছরের আর পাঁচটা দিন তিনি ধামেশ্বর মহাপ্রভু, ভগবান শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য। তবে জৈষ্ঠ্য মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী অর্থাৎ জামাইষষ্ঠীর দিনে তিনি মহাপ্রভু মন্দিরের সেবাইতদের কাছে ‘জামাতা’। ঘরের মেয়ে বিষ্ণুপ্রিয়ার স্বামী। বিষ্ণুপ্রিয়া দেবীর ভাইয়ের বংশের উত্তরপুরুষেরা বংশ পরম্পরা মহাপ্রভু মন্দিরের সেবা পুজোর অধিকারী। সারা বছর ভোর থেকে রাত ঘড়ির কাঁটা ধরে হয় তাঁর ‘আত্মবৎ’ নিত্যসেবা। তখন তিনি ভক্তের ভগবান। জামাইষষ্ঠীর দিন সেই নিমাই  হয়ে ওঠেন নবদ্বীপের জামাই। নবদ্বীপের মহাপ্রভু মন্দিরে কয়েকশো বছর ধরে চলে আসছে এই রীতি রেওয়াজ। ষষ্ঠীদাস গোস্বামীর আমল থেকে জামাইষষ্ঠী পালন শুরু হয়েছিল মহাপ্রভু মন্দিরে। ষষ্ঠীদাস ছিলেন বিষ্ণুপ্রিয়া দেবীর ভাই মাধবাচার্যের তৃতীয় পুরুষ। অর্থাৎ প্রায় ৩৫০ বছর ধরে চলে আসছে এই প্রথা।” আর কোথাও মহাপ্রভুকে এ ভাবে সেবা করা হয় না। ওইদিন ভোর সাড়ে পাঁচটায় মঙ্গলারতি হয় কীর্তন সহযোগে। আর পাঁচ দিনের মতোই এই দিনও এই মন্দিরে গাওয়া হয়-


‘‘উঠো উঠো গোরাচাঁদ নিশি পোহাইলো,

 নদিয়ার লোক সবে জাগিয়া উঠিল...’’। 


                      সোনার গৌরাঙ্গ

আমাদের দেশে ভগবানকে  পিতা, মাতা, সন্তান বলে পুজোর রীতি দীর্ঘদিন যাবৎ চালু আছে । তবে জামাই বলে দেবতাকে আপন করে নেওয়ার রীতি নবদ্বীপ ছাড়া অন্য কোথাও বড় একটা দেখা যায় না। 

নিমাইয়ের জন্ম নিয়ে নবদ্বীপে এলে দুটি স্থানের নাম শোনা যায়। কেউ বলেন নিমাই জন্মেছেন প্রাচীন মায়াপুরে । এই প্রাচীন মায়াপুরে নিমাইয়ের জন্মস্থান দর্শনার্থীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের। আজ সে জায়গায় সুন্দর একটি মন্দির গড়ে উঠেছে। এই মন্দির থেকে পায়ে হেঁটে ৫ মিনিটের পথ গেলে শ্রীচৈতন্যের বড় আবক্ষ মুর্তিটিও বেশ সুন্দর। 


তবে, অনেকে মনে করেন নিমাই মায়াপুরে জন্মেছিলেন। নবদ্বীপ থেকে লঞ্চ পেরিয়ে মায়াপুরে গেলে নিমাইয়ের জন্মস্থানে সেই মন্দিরটিও দর্শন করতে পারেন।  ওই মন্দির ISKON মন্দিরের পরেই। ISKON কথাটির বাংলা অর্থ 'আন্তর্জাতিক কৃষ্ণ ভাবনামৃত সঙ্ঘ।' শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ ১৯৬৬ সালে আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরে এই ধর্মীয় সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন। একে হরেকৃষ্ণ আন্দোলন (The Harekrishna Movement Organization) ও বলা হয়। ইসকনের উদ্দেশ্য বিশ্বব্যাপী বিশেষত ইংরাজী ভাষার মাধ্যমে ভগবদ্গীতা ও শ্রীমদ্ভাগবত অনুসারে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মহিমা কীর্তন করা, মানুষকে ঈশ্বর সম্পর্কে সচেতন করা ও বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। আধ্যাত্মিকতা ধর্মচর্চা ও ভগবৎতত্ত্ব প্রচার ছাড়াও মানব সমাজের উন্নতিতে যোগ, শিক্ষা ও নানান জনসেবা মূলক কাজকর্ম ইসকন করে থাকে।

মহাপ্রভু চৈতন্যদেব আজ থেকে প্রায় ৫৫০বছর আগে তার ভক্তবৃন্দদের প্রতিটি ঘরে ঘরে গিয়ে কৃষ্ণনাম প্রচার করার কথা বলেছিলেন। তিনি আরো বলেছিলেন-


"পৃথিবীতে আছে যত নগরাদি গ্রাম।

সর্বত্র প্রচার হবে মোর নাম।"


অর্থাৎ বিশ্বের প্রতিটি শহর ও গ্রামে তার নাম ও কর্ম প্রচারিত হবে। ইসকনের সকল সদস্যরাই শ্রীচৈতন্যদেবের অনুগামী তাই তারা মহাপ্রভু চৈতন্যদেবের কাজকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। ইসকনের প্রতিষ্ঠাতা শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কে গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর সেনাপতি বলে মনে করা হয়।  


ভারতীয় ধর্ম ও ইতিহাসের   অন্যতম শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত এ.এল ভাসান  শ্রীল প্রভুপাদ সম্পর্কে বলেছেন, তার বলিষ্ঠ পারমার্থিক দৃষ্টিভঙ্গির সাহায্যে তিনি যে গৃহ নির্মাণ করেছেন, সেখানে সারা পৃথিবীর মানুষ আশ্রয় পেতে পারে। শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ ১৮৯৬ সালের  ১লা সেপ্টেম্বর উত্তর কলকাতার হ্যারিসন রোডে জন্মাষ্টমীর দিন জন্মগ্ৰহন করেছিলেন।

তার প্রকৃত নাম অভয়চরন দে। বাবার নাম গৌরমোহন দে, মা রজনী দেবী। অভয়চরনের বাবা ছিলেন একজন বস্ত্র ব্যাবসায়ী। তারা ছিলেন সুবর্ণ বনিক সম্প্রদায়ের। গৌরমোহন দে ছিলেন শুদ্ধ বৈষ্ণব, তাই তিনি তার পুত্র কে ছোট থেকেই কৃষ্ণভক্তরূপে মানুষ করে তুলেছিলেন। শ্রীল প্রভুপাদ কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে শিক্ষা লাভ করেন।পরবর্তীকালে বৈদিক জ্ঞান বিতরণের জন্য প্রভুপাদ নিজেকে প্রস্তুত করেন ও বিদেশ যাত্রা করেন। সারা পৃথিবীব্যাপী শ্রীল প্রভুপাদের সুনাম ও সুখ্যাতি আছে ভক্তি আন্দোলনের জোয়ার রচনার জন্য। তিনি বৈদিক দর্শনের উপর ইংরাজীতে প্রচুর গ্ৰন্থাবলী রচনা করেন। প্রভুপাদের ওই সব ব‌ইগুলো ভীষণ ভাবে মানুষের কাছে সমাদৃত হয়।

ISKON মন্দির প্রভুপাদ তাঁর জীবদশাতেই তৈরির কাজ শুরু করেন। বর্তমানে এখানে আরো একটি মন্দির তৈরি হচ্ছে, যা হবে পৃথিবীর সর্বোচ্চ মন্দির।

নবদ্বীপ স্টেশন থেকে টোটো রিক্সা ভাড়া করে পৌঁছে যান নবদ্বীপ খেয়া ঘাটে। এখান থেকে লঞ্চ চলাচল শুরু হয়েছে মায়াপুর-নবদ্বীপ জলপথে। লঞ্চে ভাড়া জনপ্রতি ৭ টাকা, নৌকায় ভাড়া জনপ্রতি ৩ টাকা। মায়াপুরে ইসকন মন্দির ছাড়াও  দেখে নিন চৈতন্যভক্ত চাঁদ কাজীর সমাধি ও বল্লাল সেনের ঢিবি। ফিরে এসে ইসকন মন্দির দেখব। যদিও আমি ছাড়া অন্য কারুর এসব দেখার প্রতি বিশেষ আগ্রহ ছিল না। 


                  ইসকন মন্দির


নিমাইয়ের জন্মস্থানের মন্দিরটির (দ্বিমতে) পরই নিমাইয়ের "মাসির বাড়ি"।  এই মন্দিরটি দর্শনার্থীদের বিশেষ নজর কারে। এরপর পৌঁছে যান "বল্লাল সেনের ঢিপি"। হুলোর ঘাট থেকে বল্লাল সেনের ঢিপির দূরত্ব প্রায় ৮ কিমি পথ। 

ঐতিহাসিকদের মনে হয়েছে এই ঢিপি প্রাচীন  মন্দিরের ধ্বংসবশেষ। বল্লাল সেনের রাজত্বকালে বাংলায় বিশেষত এই এলাকায় হিন্দু ধর্মের থেকেও বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব বেশি ছিল। এই মন্দিরটি আসলে হিন্দু মন্দির না হয়ে  বৌদ্ধ মন্দিরও হতে পারে বলে ইতিহাসবিদরা অনেকেই মনে করেন । তবে এমন তথ্যও প্রমাণিত হয়েছে, বল্লাল সেনের রাজত্বকালে এই অঞ্চলের প্রচুর বৌদ্ধ মন্দির ছিল যা পরবর্তীকালে  ধ্বংস করা হয়েছিল। 

আবার অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, বখতিয়ার খিলজি নবদ্বীপ আক্রমনের সময়েও এই মন্দির ধ্বংস হয়েছিল। তবে বন্যা, ভূমিকম্প সহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণেও এই অঞ্চলের  ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকেই । বল্লাল ঢিপি নদিয়ার অন্যতম প্রাচীন প্রত্নস্থল । নবদ্বীপের নিকটবর্তী মায়াপুরে কাছে বামুনপুকুরে ভক্ত চাঁদ কাজীর সমাধিস্থল থেকে উত্তর-পশ্চিম দিকে বল্লাল ঢিপি। এই ঢিপির নীচে বল্লাল সেনের আমলে নির্মিত প্রাসাদ ছিল বলে অনুমান করা হয়। তবে বর্তমানে এটি পুরাকীর্তি সংরক্ষণ আইন অনুসারে এই অঞ্চল সংরক্ষিত করা হয়েছে। বল্লাল ঢিপি প্রায় চারশো ফুট প্রশস্থ ও উচ্চতায় পঁচিশ থেকে ত্রিশ ফুট। ঢিপিটি সবুজ ঘাসে মোড়া, আর চারিদিক কাঁটাতার দিয়ে ঘেরা রয়েছে। সেন বংশের রাজা বল্লাল সেনের নামানুসারে এই ঢিপিটির নামকরণ করা হয়েছিল। ইতিহাসবিদগণ মনে করেন ধ্বংসস্তুপটি তৎকালীন সমাজের ধ্বংস হয়ে যাওয়া শহর বিজাপুরের একটি অংশ। বিজাপুর ছিল সেই সময়ের একটি অত্যাধুনিক শহর ও সেন বংশের রাজধানী। বিজাপুর স্থাপন করেন বল্লাল সেনের পিতা রাজা বিজয় সেন।


এই বৃহদাকার ঢিপিটি ১৯৭০-এর শেষের দিকে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব দুটি পর্যায়ে খননকার্য সম্পূর্ন করেছিল। প্রথমটি ১৯৮২-১৯৮৩ সালে এবং দ্বিতীয়টি ১৯৮৮-১৯৮৯ সালে। খননে প্রাপ্ত বস্তুর মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হল, পক্ষী মূর্তি, পোড়ামাটির মানুষ ও জীব-জন্তুর মূর্তি, তামা ও লোহার নানান জিনিসপত্র, পেরেক ও নানান প্রত্নসামগ্রী। এসবই কলকাতায় যাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। খননের কারনে অঞ্চলটি বর্তমানে অনাবৃত রয়েছে। বিস্তৃত প্রাঙ্গনের মধ্যে অবস্থিত বৃহদায়তন ইটের ইমারত যার চারিদিকে ছিল উচ্চ প্রাচীর।  ইতিহাসবিদরা এই ইটের তৈরী ইমারত দেখে ইমারতটি কিসের তার সঠিক কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি। ইতিহাসবিদ্ বা প্রত্নতাত্ত্বিকরা গবেষণা ও পরীক্ষা নিরীক্ষা করে জানতে পারেন যে নিচের অংশের অনেক পরে ইমারতের উপরের অংশটি নির্মাণ করা হয়। অষ্ঠম ও নবম শতকের ধ্বংসপ্রাপ্ত পুরাতন স্থাপত্যকীর্তির উপর পুনঃনির্মিত এই সৌধের উপরিভাগ আনুমানিক দ্বাদশ শতকের। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ের মেরামত,পরিবর্তন ও সংযোজন নিদর্শন পাওয়া গেছে।


                   বল্লাল ঢিপি


এই বল্লাল সেন বাংলার সেন রাজবংশের দ্বিতীয় তথা শ্ৰেষ্ঠ নৃপতি ছিলেন। তিনি ১১৬০ থেকে ১১৭৯ সাল পর্যন্ত সেনবংশের রাজা ছিলেন। তিনি ছিলেন সেন রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা বিজয় সেনের পুত্র এবং তার যোগ্য উত্তরসূরী। রাজা বল্লাল সেন বাংলার সামাজিক সংস্কার, বিশেষ করে কৌলিন্য প্রথা প্রবর্তনকারী হিসাবে পরিচিত। তিনি সুপণ্ডিত ও লেখক ছিলেন। ‘দানসাগর’ ও ‘অদ্ভুদসাগর’ তার উল্লেখযোগ্য রচনা। বল্লাল সেন তার রাজত্বের সময় বহুদূর পর্যন্ত সাম্রাজ্য বিস্তার করেন। বরেন্দ্রভূমি, রাঢ়, বঙ্গ, এবং উত্তরপ্রদেশের মিথিলা তার অধীনস্থ ছিল। শোনা যায় বল্লাল সেন দক্ষিণাত্যের কোন  বংশদ্ভূত ব্যক্তি ছিলেন। 


বল্লাল সেনের ঢিপি দেখতে দেখতে আর ঐতিহাসিক এই তথ্য গুগুলে ঘেঁটে ততক্ষনে ভাবছি না জানি এই এলাকায় ভূগর্ভে আরও কত প্রত্নতাত্মিক নিদর্শন লুকিয়ে আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। অবিলম্বে সে সব উদ্ধার হওয়া প্রয়োজন। ভারত সরকারের পুরাতত্ত্ব দপ্তরও  অবশ্য তাই চায়। বল্লাল সেনের ঢিপি দেখে বামুনপুকুর বাজারের মধ্যে এলাম "চাঁদ কাজীর" সমাধি মন্দিরে।


চাঁদ কাজী এই এলাকার একজন ছোট রাজা ও প্রভাবশালী ছিলেন। তিনি বৈষ্ণব আন্দোলনের ঘোর বিরোধী ছিলেন।  চাঁদ কাজী বিভিন্ন সময়ে সেসময়ে চৈতন্যদেবকে হেনস্থাও করেছিলেন তবে পরবর্তী সময়ে শ্রী চৈতন্যের ভাবাদর্শ অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁর কাছে দীক্ষা নিয়ে নিজের পাপের প্রায়শ্চিত্য করেছিলেন । সেই চাঁদ কাজীর সমাধির উপর এক প্রকান্ড চাঁপা গাছ গজিয়ে উঠেছিল, যা আজও বর্তমান। জনশ্রুতি এই গাছটির আনুমানিক বয়স প্রায় ৫০০ বছর। চাঁদের সমাধি ছেড়ে এবার এলাম "খোল ভাঙা মন্দিরে"। জনশ্রুতি এই জায়গাতেই নিমাই সন্ন্যাসীর হরিনাম সংকীর্তনের সময়  খোল বাদ্যটি ভেঙেছিলেন জগাই ও মাধাই। 

কলকাতা থেকে মাঝে দুটি রাত হাতে নিয়ে এই জায়গাগুলো দেখে নিতে পারেন। প্রয়োজনে কালনায় একরাত ও মায়াপুরে এক রাত থেকে খুব কম খরচেই এই তীর্থভ্রমন কলকতাতাবাসীদের পক্ষে সম্ভব ।


লেখক:- প্রাণকৃষ্ণ মিশ্র

@All copyright reserved

#prankrishna

#প্রাণকৃষ্ণ



তথ্য ঋণ -


১) তিন তীর্থে, শিবশঙ্কর ভারতী, সাহিত্যম্‌, ১৮বি, শ্যামাচরণ দে স্ট্রিট, কলকাতা-৭৩, প্রথম প্রকাশ- ১৮ই জানুয়ারী, ২০০১

২)গৌরাঙ্গ সুন্দর দত্ত

৩) গুগুল

৪)উইকিপিডিয়া

৫) আনন্দবাজার পত্রিকা





Comments

Popular posts from this blog

বর্ধমান জেলার অনেক মানুষের সাথে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের ছিল নিবিড় যোগাযোগ

সাগরপাড়ের রানী ভাইজ্যাক

ডোডোর কেরামতি