বাঁদরের পাল্লায়
সেবার দার্জিলিং গেছি। আমার জীবনে প্রথম বঙ্গের শৈল শহর দর্শন। খুব স্বাভাবিক কারণেই আবেগ উৎকণ্ঠা বেশি। আমার এক বন্ধুর পরিবার পরিজনরা যাচ্ছেন। বাবার কাছে ঝোঁক ধরলাম আমিও যাব ওদের সাথে।
প্রথমে বাবা রাজি হননি। কিন্তু পরে আমার জেদের কাছে হার মানতে বাধ্য হলেন এই বলে যে- "যাবে যাও কিন্তু আমি পয়সা কড়ি দিতে পারব না"। যদিও আমার মনে আছে যাবার সময় বাবা ৫০০ টাকা দিয়েছিলেন। ১৯৯৬-১৯৯৭ সালের ঘটনা। তখন ৫০০ টাকার মূল্য ভালোই ছিল।
সে যাই হোক ঘোরসওয়ার রোডে(দার্জিলিং ম্যালের উপরে) একটি অপরিচ্ছন্ন জায়গায় আমাদের হোটেল নেওয়া হয়েছিল। যদিও এই জায়গাটি এখন বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। হোটেলগুলো বেশিরভাগই পাহাড়ের কোলে কাঠের তৈরি। জানলা দিয়ে বা বারান্দায় বেরুলে হোটেলগুলো থেকে পাহাড় বেশ পরিষ্কার দেখা যায়। এই রাস্তাটি একটু অপরিচ্ছন্ন বলে ভাড়াও এই জায়গায় কম থাকতো। যদিও আমার কাছে ঘুরতে গিয়ে হোটেলের বাছবিচার চিরকাল কমই। মুখ্য উদ্দেশ্য জায়গাটি ঘুরে দেখা। তবে হোটেলের রুম পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন কিনা, এট্যাচ বাথরুম আছে নাকি এগুলিই দেখে নিই।
যাই হোক এই হোটেলটি মন্দ নয়। তাছাড়া এটিই আমার জীবনে কাঠের ঘরে থাকার প্রথম অভিজ্ঞতা। তাই বেশ মজাও হচ্ছে। ভোরবেলায় টাইগার হিল দেখে ভালো লেগেছে। দুপুরে খেয়ে একটু বিশ্রাম নেব। কি মনে হলো, একটু জানলাটা খুলি। খুললাম জানালা।
জানলা দিয়ে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে বসে আছি। কিছুক্ষন পরেই দেখি একদল বাঁদর, পোঁচকা পুঁচকি নিয়ে হাজির। এদের মধ্যে একটি তো রেগে দাঁত বার করতে শুরু করেছে। আমি ভাবলাম হয়ত আমায় দেখে উনি হাসছেন। কিন্তু পরক্ষণেই বুঝলাম তা নয়, আমার ঐভাবে জানলা খুলে পাহাড়কে গিলে খাওয়া ওর পছন্দ হচ্ছে না। অবস্থা বেগতিক বুঝে আমি জানলা বন্ধ করতে যাব, জানলার পাল্লাগুলি ছিল কাঁচের।
অমনি উনি একলাফে জানলার একটি পাল্লা ধরলেন। অমনি অন্য পাল্লাটা (যেটি দড়ি দিয়ে বাঁধা ছিল ওই পাল্লার সাথে) ছিটকে এসে আমার চশমায় ধাক্কা। আমি হতচকিত।
চশমা ভেঙে খান খান। এদিকে আমার নাক দিয়ে রক্তপাত। প্রায় ৫ মি আমি সংজ্ঞা হারিয়েছিলাম সেবার।
হোটেলের মালিক বলেছিল জানলা না খুলে রাখতে। আমি শুনিনি। পরিণাম আমার রক্তপাত।
ধর্মীয় স্থান আর পাহাড়ে কিছু শহরে এই বাঁদরের উৎপাত বড্ড পীড়াদায়ক। এই বাঁদর আমার সঙ্গ ছাড়ে না। অনেকে টিকটিকি, আরশোলা ইত্যাদিকে ভয় পায়। আর আমার ভয় বাঁদর, শুয়া পোকা আর জোঁকে। এই তিনটি প্রাণী আমায় বড্ড ভালোবাসে।
বৃন্দাবনে ৩বার গেছি। সেখানেও বাঁদরের তাড়া খেয়ে প্রাণে বেচেঁছি একটি দোকানে ঢুকে। বাঁদর দেখলেই আমার চোখে চোখ পড়ে যায় ওদের। আর দেখে কে তৎক্ষণাৎ ওরা আমায় ওদের প্রজাতির ভেবে তাড়া করে।
বাঁদরের ভয়ে একবার ভাবলাম হনুমান চল্লিশা পাঠ করব। কিন্তু ভাবনা যেই না ভাবা, পরের দিনই আমার বাড়ির ছাদে কালো মুখো এক বীর হনুমান তারা করল আমায়। সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে সে যাত্রায় পায়ে মোচড় লাগলো। আজও সেই ব্যাথা মাঝে মাঝেই চাগার দেয়।
তারপর বুঝলাম হয় এরা ওদের থেকে আমায় শক্তিশালী ভাবে ,নয়ত ওদের প্রজাতির ভাবে।
সে যাই ভাবুক বাঁদরে আমার খুব ভয়। অযোধ্যায় গিয়ে আমি এই ভয়ে সরযূ নদীতে স্নান আর রামমন্দির-বাবরি মসজিদের বিতর্কিত স্থান ছাড়া আর কিছুই দেখিনি।
কারন আমার মনে হয়েছিল, এখানকার রাম ভক্তদের (হনুমান) দের অত্যাচার আরো বেশি হতে পারে।
পরে বন্ধুদের মুখে শুনি সেখানেও অত্যাচার। তবে ওই চারপায়ের বাঁদর নয়, ওরা অত্যাচারের শিকার হয়েছিল রাম মন্দির ন্যাসের কর্মকর্তা দুপায়ে রাম ভক্ত হনুমানদের।
সে অভিজ্ঞতা পরে একদিন আলোচনা করব।
আজ থাক।

Comments