মুসৌরির পথ যেন ক্যানভাসের ছবি
হর- কি পাউরি হরিদ্বারের প্রধান আকর্ষণ। আসলে এই ঘাটে গঙ্গা আরতি দেখার মত। সকাল ও সন্ধ্যায় দিনে দুবার এই পবিত্র আরতি অনুষ্ঠিত হয়। তবে সন্ধ্যাতেই এই আরতি দেখতে বেশি ভালো লাগে । তাই জনসমাগমও হয় বেশি। প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষ এই আরতি দেখার জন্য উপস্থিত হন পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গা থেকে। ভারতীয় হিন্দু ধর্মের অন্যতম প্রাচীন এই শহর যুগ যুগ ধরে ধর্মপ্রাণ মানুষদের টেনে আনে, আপন করে নেয়। অন্য ধর্মের মানুষদের ও হরিদ্বার আপন করে নিয়েছে। কারন এই শহরকে ছুঁয়েই পৌঁছাতে হয় শিখদের পবিত্র ধর্মস্থান হেমকুন্ড সাহিব,মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র তীর্থস্থান পিরণ কারিয়ার শরীফ । এককথায় হরিদ্বার উত্তরাখন্ড রাজ্যের দরজা।
পুরাণে উল্লিখিত মায়াপুরী আজকের পবিত্র হিন্দুতীর্থ হরিদ্বার। সপ্তপুরীর অন্যতম এই হরিদ্বারের পূর্বের নাম ছিল কপিলাস্থান। হর ও হরির সহাবস্থান ঘটেছে উত্তরাঞ্চল রাজ্যের সাহারানপুর জেলায় শিবালিক পাহাড়ের পাদদেশে প্রায় ২৯২ মিটার উঁচুতে। ” হরির দ্বার” নাম থেকেই আজ হরিদ্বার।
আবার সারা গাড়োয়াল হিমালয়ে হর অর্থাৎ মহাদেবের মহিমার অন্ত নেই। সে কারণে হরিদ্বারকে আজ অনেকে হর-কি-দুয়ারও বলেন। পূর্ব দিকে চন্ডী পাহাড়, পশ্চিমে মনসা পাহাড়। এরই মাঝে হরি-কি-পাউরিকে কেন্দ্র করে শহরও গড়ে উঠেছে গঙ্গার পশ্চিমে দেবভূমি হরিদ্বার।
গঙ্গা হল এখানকার মূল আকর্ষণ। পাহাড় থেকে হরিদ্বারের হরি-কি-পাউরি ঘাটে গঙ্গা নামছে সমতলে। এখানে মূল গঙ্গার প্রবাহেরও বদল হয়েছে। শহরের উত্তরে ভীমগোদায় বাঁধ দিয়ে কৃত্তিমস্রোত তৈরি হয়েছে। এখানেই গঙ্গা মাতার মন্দির। এছাড়াও শতসহস্র দেবদেবীর মন্দির।
আমি অনেক কয়েকবার হরিদ্বার এসেছি এই আরতিও প্রত্যক্ষ করেছি বারেবারে। আসলে এই শহর বর্তমানে অত্যন্ত ঘিঞ্জি শহর হলেও আমায় কেমন যেন টানে। কখনো পায়ে হেঁটে আবার কখনো গাড়িতে ঘুরেছি এই প্রাচীন শহরের আনাচে কানাচে।
কিন্তু আজ যে ভ্রমন কাহিনী বর্ণনা করছি তা আমার স্মৃতিতে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে, কারন আমার কন্যাকে সঙ্গে নিয়ে এই ভ্রমন ছিল আমার জীবনে প্রথম পিতপুত্রীর পথচলা। আমার পিতাও সঙ্গে ছিলেন সেই যাত্রায়। ওনার অসুস্থ শরীর। কিছুদিন পূর্বেই হার্টের ব্যামো ধরা পড়েছে । ভেবেছিলাম ভ্রমনসূচির পরিবর্তন করব অথবা বাতিল করব। কিন্তু কলকাতার সনামধন্য হার্ট স্পেশালিষ্ট ডাক্তার বললেন যেতে পারেন ওনাকে নিয়ে তবে পাহাড়ের খুব উচ্চতায় উঠবেন না। ওনার এনজিওগ্রাফির রিপোর্ট খুব একটা খারাপ নয় । তাছাড়া উনি মানসিক শান্তি পাবেন, তাই বারণ করছি না।
এদিকে ট্রেনের টিকিট কাটা হয়ে গেলো। আমার বোনের পরিবার ও একজন সহকর্মীর পরিবার সহ টিমের সদস্য মোট ১০ জন। বাবা ও চাইছিলেন কোথাও একটু ঘুরে আসতে।
হরিদ্বার পৌঁছিয়ে সেদিন হর -কি -পাউরির সন্ধ্যা আরতি আমাদের দেখা হয় নি। কারন ট্রেন বড্ড দেরিতে পৌঁছায়। হরিদ্বার ঘুরতে মোটামুটি ৩দিন সময় লাগে। তাই আমরাও সেইভাবেই ভ্রমনসূচি তৈরি করেছিলাম। চাপ নেই। কিন্তু আজকের সন্ধ্যায় কি করব, ধর্মশালায় বসে সময় কাটানোর কোন মানেই হয় না। তাই কিছুক্ষন বিশ্রাম নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম মায়াদেবী মন্দিরের উদ্দেশ্যে। শহরের প্রধান রাস্তাকে ছেড়ে রেললাইনের নীচে দিয়ে মনসা মন্দিরের পাদদেশে প্রশস্ত পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছালাম মায়াতীর্থে। ঘন জঙ্গলের মধ্যে এই মন্দিরের অবস্থান। এখানে এলে মন শান্ত হয়ে যায়। মন্দিরের মধ্যেই একটি গভীর কূপ আছে। কথিত আছে এই কূপের জল অত্যন্ত পবিত্র। তাই সকলে এই জল পান করেন। মন্দিরের বারান্দায় কয়েকজন সাধু সন্ন্যাসিকে লক্ষ্য করেছিলাম। এনারা মূলত এখানেই সাধনা করেন। তবে না জানার কারণে খুব বেশি দর্শনার্থী মায়ামন্দিরে আসেন না। কিন্তু এই মন্দির হরিদ্বারের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হওয়া উচিত ছিল। হরিদ্বারের পূর্বে নাম ছিল মায়াপুরী। কথিত আছে সতীর দেহত্যাগের পর রুদ্র মূর্তি ধারণ করে শিব যখন সারা বিশ্বজুড়ে মহাতান্ডব করছেন তখন সতীর বক্ষদেশ(হৃদয়) এখানে পতিত হয়। এই কারনে মায়াপুরী ৫১ পিঠের অন্যতম প্রধান পীঠস্থান। প্রাচীন কাল থেকেই বিভিন্ন মনীষী ও ভক্তবৃন্দ এই পিঠস্থানে আসেন। এই স্থলে তিনটি মন্দিরের অন্যতম মন্দিরটি মায়াদেবী মন্দির নামে খ্যাত। অপর দুই মন্দিরের একটিতে প্রাচীন নারায়ন শিলা আছে, অপরটি ভৈরব মন্দির। এদিকে রাত হয়েছে, পথে আলো থাকলেও কেমন যেন গা ছমছমে পরিবেশ। তাই দেরি না করে ধর্মশালায় ফিরে আসার জন্য হাঁটতে শুরু করি। এখানে একটি কথা না বললে নয়, হরিদ্বার গেলে আপনারা অবশ্যই যাবেন এই প্রাচীন মন্দিরটিতে। মন্দিরের চাকচিক্য আধুনিকতার জৌলুস না থাকলেও এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আপনার ভালোলাগাবে।
পরের দিন সকালে ঘুম ভাঙল বিভিন্ন মন্দিরের আরতির কাঁসর, ঘন্টার আওয়াজে। সকালে হালকা খাবার খেয়ে একটা অটো রিকশা ভাড়া করে বেরিয়ে পড়লাম কঙ্খলের উদ্দেশ্যে।। এখানে সতীর পিতা দক্ষ রাজার বাড়ি। কারন এর আগে যতবারই এসেছি ,ততবার ইচ্ছা থাকলেও আমার কঙ্খল ঘোরা হয়নি। এদিকে সতীর পিতা দক্ষরাজা অনেক দিন আগেই আমায় আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তাই এবার নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে সময় নষ্ট করলাম না। এখানে সুন্দর ও আধুনিক অনেকগুলি মন্দির গড়ে উঠেছে গঙ্গা নদীর ধারে। এই মন্দির দক্ষ প্রজাপতির জন্য উৎসর্গকৃত। মন্দিরের আশেপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সুন্দর। বহু দর্শনার্থীর ভিড় সারা বছর লেগেই থাকে। নবরাত্রির সময় এই মন্দিরে প্রচুর ভিড়ও হয়। হাতে সময় কম, এদিকে আমার কন্যার প্রণামের ধূম। যতবার ওকে টেনে কোলে তুলে ফিরতে চাই, ততবার কেঁদে ওঠে। আবার কোল থেকে নামাতেই প্রণাম শুরু করে। বেশ কিছুক্ষণ ওখানে থাকার পর একই পথে দেখে নিলাম আনন্দময়ী মায়ের আশ্রম, সীতারাম দাসের আশ্রম, সতীর দেহত্যাগের জায়গা সহ অন্যান্য কয়েকটি মঠ ও মন্দির। আসলে হরিদ্বার মানেই মন্দির শহর। ফেরার পথে বাবার ইচ্ছায় গেলাম রামদেবের পতঞ্জলি যোগপিঠ ।পথেই একটি হোটেলে দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম।
এবার গারোয়াল মন্ডলের অন্যান্য মন্দিরগুলি দর্শন করতে হবে। পথেই বিবেকানন্দ পার্ককে পাশে রেখে আমাদের গাড়ি ঢুকল ওই মন্দিরগুলির রাস্তায়। ড্রাইভারকে বললাম একবার দাঁড়ান এখানে। এই পার্কেই মহাদেবের এক সুউচ্চ মূর্তি ও স্বামীজীর মূর্তি আছে। যা হরিদ্বারের আরো একটি দেখার জায়গা। এই পথে ভারত মাতা মন্দির অন্যতম প্রধান দ্রষ্টব্যঃ। শান্তি কুঞ্জের মন্দিরটিও বিশেষ আকর্ষণের দাবি রাখে। সারা ভারত গায়েত্রী পরিবারের এই মঠটিতে আগ্রহী ব্যক্তিদের যোগা শেখানো হয়। ড্রাইভারকে বলাই ছিল আমরা মনসা মন্দিরের কাছে নামব। তাই এবার গঙ্গার সেতু পেরিয়ে উনি মনসা পাহাড়ে ওঠার রাস্তার সামনেই আমাদের নামিয়ে দিলেন।
এরপর রোপওয়ে চেপে মনসা মন্দির ঘুরে নেওয়া। যদিও আমরা কয়েকজন পায়ে হেঁটেই উঠলাম। ছোটখাট ট্রেকিং বলতে পারেন। এতেই আমার শান্তি। মনসা পাহাড়ের মনসা মন্দিরও একটি সিদ্ধ পিঠ। দেবী মনসার উদ্দেশ্যে নিবেদিত এই মন্দিরও ভক্ত সমাগম প্রচুর। এই অঞ্চলে পাহাড়ের উপরে প্রচুর ময়ূর আছে। একটু খেয়াল করলেই এদের দেখা বাড়তি পাওনা। এদিকে বিকাল হয়ে গেছে। কিছুক্ষন পরই গঙ্গা আরতি শুরু হবে। তাই ঘন্টাখানেকের মত দ্রুত পা চালিয়ে ফিরে এলাম হর-কি- পাউরির গঙ্গার ঘাটে।
আজকে দেখে নিতে হবে হর- কি-পাউরির সন্ধ্যা আরতি।
আরতি শুরু হলো বিকাল ৬ টায়। চারিদিক থেকে কাঁসর,ঘন্টার আওয়াজে আকাশ বাতাস মুখরিত। সঙ্গে ধুনা ,ধূপের মিষ্টি গন্ধ। যে গঙ্গার ঘাট কিছুক্ষন আগে ছিল একদম ফাঁকা, সেই ঘাট ধীরে ধীরে পূর্ণ হলো জনকোলাহলে। তিল ধারণের জায়গা পর্যন্ত নেই গঙ্গার উভয় পাড়ে। চারিদিকে মাইকে বেজে উঠল গঙ্গা আরতির বিশেষ গান অনুরাধা পরোয়ালের কন্ঠে, সাথে সাথেই পুরোহিতদের আরতি শুরু। একসাথে অনেকজন মিলে আরতি। সাথে সাথে গঙ্গায় প্রদীপ ভাসিয়ে আরতি শুরু করলেন ভক্তবৃন্দ। সে এক নৈস্বর্গিক দৃশ্য প্রত্যক্ষ করলাম আমরা। কন্যার অনুরোধে আমরাই বা বাদ যাই কেন? তাই আমরাও একটি প্রদীপ কিনে আরতি করলাম গঙ্গা মায়ের। তারপর আমার কন্যার প্রদীপ ভাসানো।
দ্বিতীয় দিন সকালে একটু গাড়ি ভাড়া করে গেলাম ঋষিকেশ। কোন এক সময় এই ঋষিকেশেই অনেক মুনিঋষি তপস্যা করতেন, সেই থেকেই গঙ্গার উভয় তীরে গড়ে ওঠা এই শহরের নাম ঋষিকেশ। হরিদ্বার থেকে ১৮ কিমি দূরত্ব। গঙ্গার দুই তীরের সংযোগ রক্ষাকারী দুটি ঝুলন্ত ব্রিজ লক্ষনঝুলা ও রামঝুলা।
আমরা লক্ষনঝুলা দিয়ে ব্রিজ পার হয়ে প্রথমে, স্বর্গাশ্রম, গীতাভবন, মহাদেব মন্দির দেখে গঙ্গার অন্য পাড় দিয়ে রামঝুলার দিকে এগিয়েছি। রাস্তার দুইপাশে ছায়াঘন বিভিন্ন মহীরুহ পথের ক্লান্তি দূর করার জন্য সদা বিরাজ করছে। ওদের বিশ্রাম নেই, যেন পথিকের ক্লান্তি দূর করাই ওদের একমাত্র কর্তব্য। রামঝুলার পথে হাঁটতে হাঁটতে অজস্র মন্দির চোখে পড়ে। তারই মধ্যে একে একে দেখে নিলাম এমবম্বকেশ্বর মন্দির, ভুতনাথ মন্দির, লক্ষনমন্দির, ভারতমাতা মন্দির, চন্দ্রেশ্বর শিব মন্দির।
ঋষিকেশ যাবার সময় ড্রাইভার বললেন আজ আকাশ পরিষ্কার। ঘুরে নিতে পারেন
দেবপ্রয়াগ। সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশ এই রাস্তার। আর সত্যিই মন্দির দেখতে দেখতে আর ভালো লাগছে না।বন্ধু লালুকে বললাম চলো একটু ঘুরে আসি পাহাড়ে। সেও রাজি, তাই গাড়ি নিয়েই ছুটলাম দেবপ্রয়াগের পথে। পথে পড়ল বশিষ্ট মুনির গুহা। রাজপথ থেকে অনেকটা নেমে গঙ্গা তীরে এর অবস্থান। গুহার মধ্যে একটি মাত্র প্রদীপের আলো। গুহাপথে প্রবেশ করতে করতে পায়ে ঠেকছে মেডিটেশনরত মানুষজন। শান্ত ও নীরবতা গুহামধ্যে চঞ্চল মনকে সেদিন কিছুক্ষনের জন্য হলেও শান্তিপ্রদান করেছিল সকলের। একপাশে আমরাও ধীরে ধীরে বসে পড়লাম। সময় বড্ড দ্রুতগামী। এখানে বেশিক্ষন অপেক্ষা করলে দেবপ্রয়াগ দেখা হবে না। তাই আবার গাড়িতে ওঠা।
দেবপ্রয়াগ অলকানন্দা ও ভাগীরথীর মিলনস্থল। গঙ্গার ঝুলন্ত ব্রিজ পেরিয়ে ওপারে পৌঁছিয়ে গেলাম সেই পবিত্র মিলনস্থলে। এখানে শ্রী রামচন্দ্রের পায়ের ছাপ আছে। ভয়ঙ্কর শব্দে ভাগীরথী ও অলকানন্দা মিলিত হয়েছে এই জায়গায়। দুটি নদীর জলের রঙ দুই রকমের। এখানেই তপস্যারত এক বিদেশি সন্ন্যাসীর দেখা মিলল। দীর্ঘদিন উনি এখানেই তপস্যা করছেন। কত বছর ভারতে এসেছেন বা হিন্দু ধর্মে দীক্ষিত হয়েছেন জানতে চাইলে কিছুই বললেন না। গুহার মধ্যে যজ্ঞ কুণ্ডের সামনে শান্তভাবে বসে আছেন। সে এক আশ্চর্য অনুভূতি ওনার চোখে মুখে। আমাদের দেবতার উদ্দেশ্যে নিবেদন করে প্রসাদও দিলেন। আমার কন্যাকে মাথায় হাত দিয়ে আর্শীবাদ করলেন ।
এবার ফিরে আসার পালা। সূর্য পশ্চিমগামী। পাহাড়ের পাকদন্ডী পথ অতিক্রম করে গঙ্গার শোভা দেখতে দেখতে আবার ঋষিকেশ হয়ে ফিরে আসা হরিদ্বারের পথে। মন চাইছিল আরো উপরে উঠতে। অর্থাৎ কেদারনাথ বা বদ্রিনাথের পথে। অন্তত শ্রীনগর পর্যন্ত এগুতে। কিন্তু এ যাত্রায় উপায় নেই। কয়েকটি জায়গায় রাফটিং দেখার জন্য গাড়ির গতিনিয়ন্ত্রন করার অনুরোধ জানালে ড্রাইভার গাড়ি দাঁড় করালেন । হরিদ্বার ফিরে এসে একবার ধর্মশালায় ঢুকতে হলো। একটু পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হতে হবে। তারপর রাতের খাবার খেয়ে নিদ্রামগ্ন হবার পালা। কারন আগামী কাল পৌঁছাতে হবে মুসৌরি। তাই সকাল সকাল ঘুম ভাঙতেও হবে।গাড়ি বলা আছে।
ধর্মশালা থেকে সন্ধ্যা ৮ টায় বেরিয়ে সোজা খাবারের হোটেলে। আর আমার পছন্দের হোটেল এখানে দাদা বৌদির হোটেল। জানিনা কে এই দাদা-বৌদি। তবে এখানে নিরামিষ ভোজন সত্যিই মুখে লেগে থাকে। এখানে ১৪টি দোকান আছে যাদের নাম ‘দাদা-বৌদির হোটেল’। সবকটাতেই শুদ্ধ নিরামিষ বাঙালি খাবার পাওয়া যায়। মালিকও বাঙালি, খদ্দেরও বাঙালি, তাই ঢুকলেই আপনার মনে হবে আমি বাঙলাতেই আছি। সবার সামনেই লম্বা লাইন পড়ে দুপুরবেলা। মেনু মোটামুটি একই রকম। দেরাদুন চালের ভাত, ঘি, বেগুন বা আলু ভাজা, ডাল, কপি বা অন্য সবজির দুটো তরকারি, চাটনি, পাঁপড়। ঢুকলেই শুনতে পাবেন, এখানে আরেকটু তরকারি হোগা? কিংবা পাঁপড় তো নরম হো গয়া, ভাজা নেহি হ্যায় ঠিক করে। অনভ্যাসের হিন্দি আর কি!
মথুরাবালার মিষ্টির দোকান আছে, যেখানে হরিদ্বারের বিখ্যাত প্যাড়া পাওয়া যায়। খাঁটি দুধ আর রাবড়ির জন্যে আছে ত্যাগীর দোকান। সবকটাই হর কি পৌরির পথে বাজারের গলিতে। হরিদ্বারের এই বাজার বেশ জমকালো, এমনকি ফুটপাথের দোকানগুলিও। কি না পাওয়া যায়। শীতবস্ত্র ,কম্বল ,শাল, দেরদুন রাইস থেকে শুরু করে রুদ্রাক্ষ। পাবেন বিভিন্ন ইলেকট্রনিক দ্রব্য থেকে লাঠি, ঝাঁটা। সেই কারণে হরিদ্বার এলে বাঙালির মন চায় গোটা বাজারটিকেই তুলে নিয়ে যেতে।
সকালে ধর্মশালার মন্দিরের কাঁসর, ঘন্টার আওয়াজে গতকালের মতই আজও ঘুম ভাঙল। এই কারনে আমি রামলীলা ময়দানের যে কোন একটি ধর্মশালা পছন্দ করি। বাজার কাছে, সামনেই গঙ্গা, পরিবহনের সুবিধা আছে এখানে। সকালে ঘুম থেকে উঠে হাতমুখ ধুয়ে প্রাত:কর্ম সেরে আমরা তৈরি হয়ে নিয়ে উঠে বসি গাড়িতে। হালকা টিফিনের দরকার ছিল কিন্তু আমরা ঠিক করলাম দেরদুনে পৌঁছে সেই কাজ সারব। ঘন্টা খানেকের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম দেরদুনে। এখানে দেখে নেওয়া সহস্রধারা পার্ক ও শিব মন্দিরটি। কথিত আছে দ্রোনাচার্য এখানেই তপস্যা করেছিলেন। এখানে এসেই হালকা প্রাতরাশ সেরে নেওয়া।পাহাড়ি অঞ্চলে এলে একটু বেশি ক্ষিদে পায়।পেটও কথা শোনে না। সহস্রধারায় স্নান করলে চর্মরোগ সেরে যায়। এটা শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসই না, এরমধ্যে বৈজ্ঞানিক কারন ও আছে। এই জলে সালফারের পরিমান বেশি তাই এই জল চামড়ার রোগের পক্ষে উপকারী। সঙ্গে দেখে নেওয়া পুরানে বর্ণিত ঐতিহাসিক শিব মন্দিরটি। উত্তরাখন্ড জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এমনই অসংখ্য শিব মন্দির ও শিব উপাখ্যানের কাহিনী। সহস্রধারায় নৌকাবিহারেরও সুবিধা আছে। কিন্তু সে ইচ্ছা আমাদের কারুর ছিল না। তাই ঘন্টাখানেক সময় অতিবাহিত করেই রওনা দিলাম মুসৌরির পথে।
ভয়ঙ্কর সৌন্দর্য এই পথের। এই পাকদন্ডী পথের সৌন্দর্যের বর্ণনা না দেখলে লিখে প্রকাশ করা বড়ই মুশকিল। মুসৌরি যাবার পথে গাড়ি এসে পৌঁছালো অন্য একটি শিবমন্দিরে। মন্দিরের পাশেই অন্য একটি বৌদ্ধ মন্দির। এই শিবমন্দিরে সব দর্শনার্থীকে প্রসাদ খাওয়ানোর রেওয়াজ। পেট ভরে গেল এখানে হালুয়া প্রসাদ খেয়ে। হালকা ঘুম আসছে। কিছুক্ষন পর এসে পৌঁছালাম “লেক মিষ্টিতে”। এটি মুসৌরির অন্যতম প্রধান দর্শনীয় স্থান। চারিদিকে পাইনের জঙ্গলে ঘেরা এই লেকটি ধাপে ধাপে নিচের নেমেছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অতুলনীয়। বেশ কিছুক্ষণ এখানে কাটিয়ে পৌঁছালাম মুসৌরি শহরের প্রাণকেন্দ্র “মেল অঞ্চলে”।
কেমটি ফলস
মুসৌরি পৌঁছাতে দুপুর পেরিয়ে প্রায় বিকাল হয়ে গেল। আসলে পথেই অনেকটা সময় ব্যয় করেছি। ড্রাইভারের ও কোন বিরক্ত নেই। পাহাড়ি লোকেরা অনেক সহনশীল। পর্যটকের কথা ভেবে এরা সবকিছুই মেনে নিতে জানে। হোটেল ভাড়া করা ছিল না। তাই হোটেল খুঁজতে বেশ কিছুটা সময় লেগে গেল। এদিকে আমার তিন বছরের কন্যার চোখে মুখে বিরক্তের ছাপ। ওকে একটা আইসক্রিম দিয়ে বসিয়ে রাখলাম ওর মায়ের কোলে। বলে রাখি মুসৌরিতে হোটেলের ভাড়া বড্ড বেশি। যা আমাদেরও জানা ছিল না। মেল থেকে একটু দূরে ঠিক হোটেল বলব না , একটি মন্দিরের রেস্ট রুমে ১৫০০ টাকা দিন পিছু ভাড়ায় দুটি ঘর নিয়েছিলাম। এখানে দুই রাত থাকব। তাই ব্যাগপত্র ঘরে রেখে বেরিয়ে পড়লাম “কেমটি ফলসের পথে”। কেমটি ফলস এশিয়ার মধ্যে নামকরা ফলস। এর সৌন্দর্য লিখে প্রকাশ করা মুশকিল। এখন তো ইউ টিউবের যুগ। তাই এক্ষুনি যাঁরা যাবেন না তাঁরা ইউ টিউবে একবার দেখে নিতে ভুলবেন না। বেশ কিছুটা সিঁড়ি বেয়ে ফলসের এক্কেবারে নিচের নেমে স্নান করার ব্যবস্থা আছে। ওই সন্ধ্যায় টিউব ভাড়া নিয়ে স্নান করার লোভ আমরা সামলাতে পারিনি। হিম শীতল জলরাশি। তবুও ঠান্ডার ওই কষ্ট ক্ষনিকের আনন্দের কাছে সেদিন হার মেনেছিল।
“কেমটি ফলস” থেকে উঠে গাড়ি নিয়ে চলে গেলাম মুসৌরির সর্বচ্চ স্থান “লাল তিব্বা”। এখন থেকে নিলাঙ্গ, শ্রীকান্ত,সতপন্থ, কেদারনাথ, বদ্রিনাথ, কামেট প্রভৃতি পর্বত শৃঙ্গগুলি দেখা যায়। যদিও সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় সেসব কিছুই দেখা যায়নি। তা নাই যাক, পরে আবার আসা যাবে এই সান্তনা মনে নিয়ে ফিরে এলাম মুসৌরি ম্যাল। সুন্দর শান্ত আলোঝলমলে পরিবেশ। ম্যাল বলতে পাহাড়ের উপরে প্রশস্ত জায়গা যেখানে বাজার গড়ে ওঠে। মুসৌরি ম্যাল থেকে নিচের শহরগুলো বিশেষত দেরদুন শহরকে রাতের অন্ধকারে সুন্দর লাগে। মনে হয় যেন তারাদের দেশের অনেক উপরে আমরা।
আমাদের থাকার জায়গায় খাবারের কোন ব্যবস্থা নেই। তাই ম্যালের একটি হোটেলে চরাদামে রাতের খাবার খেয়ে ফিরে আসা হোটেলে। আমাদের আরো একদিন মুসৌরিতে হোটেল ভাড়া করা আছে। তাই ইচ্ছা হলো ইকো ট্যুরিজমের পীঠস্থান ধনৌল্টি ঘুরে নেবার। সকলেই রাজি। আমার পূজনীয় পিতৃদেব ও কন্যাও সুস্থ। ভাগ্না তাতাই, সে তো একপায়ে খাড়া। সে সময় ভাগ্নার ১০ বছর বয়স।
পরের দিন সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে সকলে তৈরি হয়ে নিলাম ধনৌল্টি যাবার জন্য। আসলে এখানে যাবার কোন পূর্ব পরিকল্পনা আমাদের ছিল না। আর বেড়াতে বেরিয়ে জানবেন ভাবনার মধ্যে থাকা কোন জায়গা যেতে না পারলে কষ্ট হয় যেমন, ঠিক তেমনি ভাবনার বাইরে নতুন জায়গা সংযোজিত হলে ততটাই আনন্দ হয় মনে। কিন্তু সকাল থেকেই বৃষ্টি হওয়ার কারনে সেদিন কোন গাড়ি যেতে চাইছিল না ধনৌল্টিতে। আবার যাঁরা যেতে চাইল তাঁরা লাগামহীন ভাড়া চেয়ে বসল। অগত্যা মন খারাপ নিয়ে বসে আছি পথের ধারেই। এমন সময় ভগবানের দান বলতে পারেন একটি সব্জী গাড়ি মুসৌরি থেকে ধনৌল্টি ফিরছে দেখলাম। আসলে যে চায়ের দোকানে চা খাচ্ছিলাম তিনি ড্রাইভারকে বলে রাজি করলেন যৎসামান্য ভাড়ায়। উঠে পড়লাম সেই গাড়িতে। এ এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা। গাড়িতে উঠে বুঝলাম শুধু সব্জী না এই গাড়িতে ছাগল পরিবহন ও করা হয়।
ইকো পার্ক, ধনৌল্টি
ড্রাইভার কে জিজ্ঞাসা করলাম “ভাইয়া বাপস ক্যাইসে আয়ুঙ্গা?”
উনি বললেন সন্ধ্যায় যে সব্জির গাড়ি আসবে তাতে উনি ব্যবস্থা করে দেবেন। এদিকে বাইরে ভীষন বৃষ্টি। গাড়ির ভিতরে ছাগের গন্ধ। সহযাত্রীদের মুখ গম্ভীর। আমার পিতৃদেব তো বলেই বসলেন “এ কোন পাগলের পাল্লায় পড়েছি”।
আমার চোখ পাহাড়ের সৌন্দর্য উপলব্ধিতে ব্যস্ত। কন্যাকে জড়িয়ে ধরে গাড়িতে বসে উপলব্ধি করছি সেই পথের নৈশ্বর্গিক সৌন্দর্য। মাত্র ৩০ কিমি রাস্তা। ধনৌল্টি পৌঁছাতে সময় লাগল প্রায় ২ ঘন্টা। ইকো পার্কের সামনে গাড়িটি যখন দাঁড়ালো তখন বৃষ্টির পরিমান অনেকটা কমেছে। কিন্তু মেঘেরা আমাদের গায়ে জড়িয়ে যাওয়ায় তীব্র কাঁপুনি দিচ্ছে সকলের। এদিকে হালকা ভিজেও গেছি। কন্যাকে চাদরের সাথে কখনো পেটে কখনোবা পিঠে বেঁধে ঘুরে বেড়ানো কষ্টমাখা আনন্দের এক পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল। প্রকৃতি বিরূপ না হলে সুরকুণ্ড মায়ের মন্দির নিশ্চয় ঘুরে আসতাম। কিন্তু তা হলো না । অন্য একটি গাড়ি ভাড়া করে সন্ধ্যা নামার আগেই ফিরে এলাম মুসৌরি শহরে।
আজও রাতে মুসৌরিতেই থাকতে হবে। গিন্নি গোছগাছে ব্যস্ত। আগামী কাল সকালে রওনা দিতে হবে হরিদ্বার। তাই আমি ও আমার অফিস কর্মী দুজনে আরো একবার এলাম ম্যালেতে। ফেরার সময় রাতের খাবার পার্সেল করে ফিরলাম ধর্মশালায়।
মুসৌরি যাবার পথে ইউ টার্ন পাহাড়ি পথটি সত্যিই সুন্দর। এই পথ ধরেই নেমে এলাম হরিদ্বার। ট্রেনের পরের দিন আমাদের ফেরার ট্রেন রাত্রি ১০ টায় দুন এক্সপ্রেস। হরিদ্বার ফিরে অন্যান্য সহযাত্রীরা কেনাকাটিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল । কিন্তু ওসব আমার ঠিক পছন্দ হয় না। তাই আমি ফিরে গেলাম হর- কি-পাউরি ঘাটে। এখানে সন্ধ্যা আরতি দেখার লোভ সামলাতে পারিনা।
এই রে চন্ডী পাহাড়ে তো যাওয়া হলো না। হোটেলে ফিরে প্রস্তাব দিলাম সকলকে আগামী কাল সকালেই চন্ডী পাহাড়ে যাবার। ১৯২৯ সালে কাশ্মীরের রাজা এই মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। চন্ডী পাহাড়ের উপরে এই মন্দির সত্যিই সুন্দর। এখানে পবন পুত্র হনুমানের মাতা অন্জনীর মন্দির আছে। পিতৃদেব ও আমার বোনকে হোটেলে রেখে হেঁটেই উঠলাম চন্ডী পাহাড়ে। এখানে বলে রাখি যে পথ হেঁটে ওঠার জন্য নির্দিষ্ট সেই পথেও না। আমরা উঠেছিলাম অন্য একটি বন্য রাস্তায় ট্রেকিং করে। যায় হোক ট্রেকিং এর স্বাদও মিটিয়ে নিলাম। যদিও এই পথে আমরা ছাড়া অন্য কোন পথিককে উঠানামা করতে দেখিনি। এই পথ আসলে পথ না, এ পথ আমারই উদ্ভাবন।যদিও পরে বুঝেছিলাম একটু বেশিই ঝুঁকি নিয়েছিলাম। ফিরে এসে গঙ্গা স্নান সেরে দাদা- বৌদির হোটেলে খেয়ে নিয়ে দিবা ঘুম। রাতে ট্রেন । এবার ফেরার প্রস্তুতি।
এ যেন স্বর্গসব শেষে বলি মন্দির শহর হরিদ্বার সত্যিই সুন্দর। তাঁর চেয়েও সুন্দর এই পথের মুসৌরি ও ধনৌল্টি। তাই প্রকৃতি প্রেমী মানুষদের গন্তব্য ধনৌল্টির চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। জানিনা আগামী দিনে ধনৌল্টির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য শহুরে মানুষের চাপে বজায় থাকবে কিনা? জানিনা কংক্রিটের জঙ্গল গ্রাস করবে কিনা পাইনের জঙ্গলকে। শুধু একজন পর্বতপ্রেমী মানুষ হিসাবে সকলের কাছে সচেতনতার আহবান জানাই, পাহাড়ের শুদ্ধতা, শান্তি ,পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার।
কি ভাবে যাবেন :- হাওড়া থেকে কুম্ভ এক্স, উপাসনা ,দুন এক্সপ্রেসে হরিদ্বার আসা যায়।
থাকার জন্য :-বিভিন্ন দামের হোটেল ও ধর্মশালা আছে। থাকার জন্য অসুবিধা নেই। তবে মুসৌরিতে হোটেল ভাড়া একটু বেশি যেন।
Comments