এমার্জেন্সি দপ্তর
এমার্জেন্সি দপ্তর।
একসময় যখন চাকুরিতে এই দপ্তরে কেউ যুক্ত হন তখনই গর্বে তাঁর বুক ফুলে ওঠে।
"আমি এমার্জেন্সি একটা দপ্তরের কর্মচারী"।
মানুষের বিপদে, আপদে আমি কাজ করি। এ তো সৌভাগ্যের ব্যাপার। একজন ব্যক্তি যে এমারজেন্সি দপ্তরেই কাজ করুন না কেন, একটা সুপ্ত গর্ববোধ হয়ই হয়। স্বাস্থ কর্মচারী, পুলিশ, বিদ্যুৎ দপ্তর, পৌরসভা ও পঞ্চায়েতের জল সরবরাহ দপ্তর, অগ্নি নির্বাপক দপ্তর, বনবিভাগের কর্মচারী থেকে সৈনিকরা সকলেই এই এমার্জেন্সিতে দপ্তরের কর্মচারী।
জানেন আমি যখন এমন একটা দপ্তরে কাজ শুরু করি তখন আমারও একই রকম গর্ববোধ হয়েছিল। তারপর উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের চাপে সেই গর্ববোধ এক সময় ফিকে হতে শুরু করে।
কর্তৃপক্ষ বা জনসাধারণ যদি অমানবিক আচরণ করে তাহলে আমাদের মত কর্মচারীরা আশাহত হয়।
কর্তব্য বা দায়িত্ব পালনে ত্রুটি না থাকলেও যখন প্রশাসনের কর্তাদের চোখ রাঙানি শুনতে হয় তখন এক এক সময় অন্নপ্রাশনের ভাতও গলা দিয়ে উঠে আসে।
এর উপর আছে এদেশে রাজনৈতিক দাদাদের মাতব্বরি, চোখরাঙানি।
এবার একটু আমাদের কর্তব্য নিয়ে কথা বলি।
আমি জল সরবরাহ দপ্তরের কর্মী। ভু গর্ভস্থ জল যন্ত্রের সাহায্যে মাটির তলা থেকে উত্তোলন করে পাইপ লাইনের মাধ্যমে তা গৃহস্থের বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেওয়া আমার কাজ। কাঁধে করে জল পৌঁছে দিতে হয় না এটাই রক্ষা।
আমাকে ডিউটি করতে হয় সকাল ৬.০০ টা থেকে সন্ধ্যা ৫.০০ টা পর্যন্ত। অবশ্য একই শহরে বসবাস করার জন্য মাঝের কিছুটা সময় বাড়ি এসে স্নান করে, কিছু নাকে চোখে মুখে গোঁজার সময় টুকু অবশ্য পাই। এরই মধ্যে আছে সন্তানকে তাঁর বিদ্যালয়ে পৌঁছে দেওয়া, বাজার দোকান করা, গৃহস্থালির কিছু কাজ। কিন্তু এসব কাজের জন্য খুব বেশি সময় থাকে না বুঝতেই পারছেন।
এরপর হঠাৎ যদি গিন্নি বলে একটু ওর বাপের বাড়ি যেতে-আমি বা আমার সহকর্মীরা কেউই তা পারি না। কারন সকাল ৬.০০ টা থেকে বিকাল ৫.০০ টা এই ১১ ঘন্টা কোনভাবেই শহরের বাইরে যাবার অধিকার আমাদের নেই।
হঠাৎ গিন্নি ফোন করে যদি বলে- "হাঁ গো নুন ফুরিয়ে গেছে একটু এনে দেবে?" আমাদের উত্তর একটাই -সময় নেই এখন।
বাড়িতে কেউ অসুস্থ ঔষধ আনতে হবে? সেই সন্ধ্যার পর ছাড়া উপায় নেই।
সচরাচর অন্যান্য এমার্জেন্সি দপ্তরের কর্মচারীদের যত দিন অফিস ছুটি থাকে ততগুলি CCL পায় তারা। এটাই নিয়ম। আমাদের ক্ষেত্রে নিয়ম -সারা বছরে মাত্র ১২ দিন।
বউ বলল দুর্গাপূজা একটু চলো ঘুরে আসি বাপের বাড়ি। আমরা ছুটি পাব না। কারন অফিস বলবে রিলিভার নেই।
সারাবছর বিভিন্ন পূজা ও পরব, বিভিন্ন দেশবরেণ্য নেতাদের জন্ম মৃত্যুদিন বাবদ একজন অফিস কর্মচারী ছুটি ভোগ করেন অন্তত বছরে ৩০ দিন। আমরা বঞ্চিত। আমরা ছুটি পাব বছরে ওই ৩০ দিনের জন্য মাত্র ১২ দিন। এছাড়াও স্থানীয় উৎসব বাবদ ছুটিগুলি তো বাদ দিন। ওসব আমাদের মত কর্মচারীদের জন্য নয়।
এবার আসি চাপের কথায়। ধর্মীয় তোষামোদ করতে এদেশে জানেন রাজনৈতিক নেতারা সিদ্ধ হস্ত।
কয়েকটি পূজায় বা রোজা মাসে বাড়তি সময় জল সরবরাহের নির্দেশ। রোজামাসে ১মাস বাড়তি জল দিতে হবে।
এবার জনগনের চাপ। দাদা স্নান করব, আর একটু জল চালান। দাদা প্রকৃতির ডাকে বসে আছি , মগে জল নেই। একটু চালিয়ে দিন।
উফ, বন্ধ করে দিলেন? এই জন্যই আপনারা কেলানি খান। দেখছেন না আমি বালতিটা ভর্তি করছি?
ও স্যরি দাদা ভুলেই গেছি-আমি আমরা এমার্জেন্সি দপ্তরে কাজ করি।
আমাদের সংসার, আনন্দ, ভ্রমন , বন্ধুবান্ধবের সাথে আড্ডা এসব করতে নেই।
কারন একটাই -আমরা এমার্জেন্সি দপ্তরে কাজ করি।
Comments