মে দিবস কি ?
আমার মত বোকা মানুষ খুব কমই আছে এই ভারতে। তবে আছে তাঁরা ওই লালঝান্ডা কাঁধে নিয়েই। তাঁরা গর্ববোধ করে লালঝান্ডা কাঁধে নিতে। শ্লোগান দেয়-"দুনিয়ার মজদুর এক হও, ইনকিলাব জিন্দাবাদ।"
কতবার কত রকম ভাবে শেখানো হয় এদেশে - "বিশ্বকর্মা ভারতবর্ষের প্রথম শ্রমিক।" তাই বিশ্বকর্মা পুজার দিনই শ্রমিক দিবস পালন করতে হবে।
কিন্তু আমার মন একবারও সায় দেয় না ওই দিনকে শ্রমিক দিবস হিসেবে মানতে।
কোথায় শিকাগো শহর বাপের জন্মে কোন দিন ওই শহরটা যাবার সৌভাগ্য হবে কিনা তাঁর ঠিক নেই। আমার পূর্ব পুরুষদের কেউ ওই সময় শিকাগোর আন্দোলনে শহীদও হননি।তবুও ওই শহরের শ্রমিকদের ৮ ঘন্টা কাজের দাবিতে লড়াইয়ের স্বীকৃতির দিনটিকেই শ্রমিক দিবস হিসেবে মেনে নিতে মন চায় বারেবারে।
মে দিবসের ইতিহাস কি ?
-----------------------------------
১৮৮৬ সালে আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটের ম্যাসাকার শহীদদের আত্মত্যাগকে স্মরণ করে পালিত হয়। সেদিন দৈনিক আটঘন্টার কাজের দাবীতে শ্রমিকরা হে মার্কেটে জমায়েত হয়েছিল। তাদেরকে ঘিরে থাকা পুলিশের প্রতি এক অজ্ঞাতনামার বোমা নিক্ষেপের পর পুলিশ শ্রমিকদের ওপর গুলীবর্ষণ শুরু করে। ফলে প্রায় ১০-১২জন শ্রমিক ও পুলিশ নিহত হয়। ১৮৮৯ সালে ফরাসী বিপ্লবের শতবার্ষিকীতে প্যারিসে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক-এর প্রথম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ১৮৯০ সাল থেকে শিকাগো প্রতিবাদের বার্ষিকী আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন দেশে পালনের প্রস্তাব করেন রেমন্ড লাভিনে। ১৮৯১ সালের আন্তর্জাতিকের দ্বিতীয় কংগ্রেসে এই প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়। এরপরপরই ১৮৯৪ সালের মে দিবসের দাঙ্গার ঘটনা ঘটে। পরে, ১৯০৪ সালে আমস্টারডাম শহরে অনুষ্ঠিত সমাজতন্ত্রীদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এই উপলক্ষে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। প্রস্তাবে দৈনিক আটঘন্টা কাজের সময় নির্ধারণের দাবী আদায়ের জন্য এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বিশ্বজুড়ে পয়লা মে তারিখে মিছিল ও শোভাযাত্রা আয়োজনের সকল সমাজবাদী গণতান্ত্রিক দল এবং শ্রমিক সংঘের (ট্রেড ইউনিয়ন) প্রতি আহবান জানানো হয়। সেই সম্মেলনে “শ্রমিকদের হতাহতের সম্ভাবনা না থাকলেও বিশ্বজুড়ে সকল শ্রমিক সংগঠন মে’র ১ তারিখে “বাধ্যতামূলকভাবে কাজ না করার” সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।অনেক দেশে শ্রমজীবী জনতা মে মাসের ১ তারিখকে সরকারি ছুটির দিন হিসাবে পালনের দাবী জানায় এবং অনেক দেশেই এটা কার্যকরী হয়। দীর্ঘদিন ধরে সমাজতান্ত্রিক, কমিউনিস্ট এবং কিছু কট্টর সংগঠন তাদের দাবী জানানোর জন্য মে দিবসকে মুখ্য দিন হিসাবে বেছে নেয়। কোন কোন স্থানে শিকাগোর হে মার্কেটের আত্মত্যাগী শ্রমিকদের স্মরণে আগুনও জ্বালানো হয়ে থাকে। পূর্বতন সোভিয়েত রাষ্ট্র, চীন, কিউবাসহ বিশ্বের অনেক দেশেই মে দিবস একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন। সে সব দেশে এমনকি এ উপলক্ষে সামরিক কুচকাওয়াজের আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ এবং ভারতেও এই দিনটি যথাযথভাবে পালিত হয়ে আসছে। ভারতে প্রথম মে দিবস পালিত হয় ১৯২৩ সালে।
আজও সারা পৃথিবীতে শ্রমিক শ্রেণীর বিরুদ্ধে অকথ্য অত্যাচার নামিয়ে আনছে পুঁজিপতি শ্রেণী। ভারতবর্ষেও তাঁর ব্যতিক্রম হচ্ছে না। কর্পোরেট সেক্টরে আজও কোথাও কোথাও ৮ ঘন্টার বদলে ১০ ঘন্টা অধিক শ্রম দিতে হয় । বিনিময়ে অনেক কোম্পানিতে ওভারটাইম ও দেওয়া হয় না। চা শ্রমিক, খনি শ্রমিকদের উপর অকথ্য অত্যাচার আজও চলছে।
এদেশের সরকার ৮ ঘন্টা কাজের দাবী কে মেনে নিলেও আজও শ্রমিক কল্যানে বিশেষ কোন ভালো ব্যবস্থা নেয়নি। মে দিবস কেবলই একটা ছুটির দিন হিসাবেই পালিত হয় এ দেশে। এমনকি সরকারি কোন কর্মসূচিও পালিত হয় না এই দিনটিকে স্মরণ করে।
আসলে মে দিবসের তাৎপর্য জনগণকে জানালে সরকারেরই ক্ষতি। সেই কারনে সরকার নির্বিকার থাকে, নীরব থাকে।
তাই এই তাৎপর্য জনগণকে বোঝানোর দায়িত্ব নিতে হবে এদেশের শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বের দলগুলিকেই। কেবল পতাকা উত্তোলন করে দিনটি পালন করা নয়। মিছিল, মিটিং, শ্রমিক মহল্লায় পথসভা ,পথনাটিকা করে মে দিবসের তাৎপর্য ছড়িয়ে দিতে হবে জনসাধারণের মধ্যে আরো বেশি বেশি করে। এ কাজ করতে হবে ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায়।
তবেই হবে সফল শ্রমিক আন্দোলন।
মে দিবস জিন্দাবাদ।
দুনিয়ার মজদুর এক হও।
ভেঙে দাও পুঁজিবাদের অশুভ চক্রান্ত।
সূত্র:-উইকিপিডিয়া
Comments