লকডাউন ও বিদ্যালয়

২০২০ সালের ২৪ সে মার্চ দেশে লকডাউন শুরু হলো। একরকম হঠাৎই লকডাউনের ডাক। করোনা আতঙ্ক তার কয়েকমাস ধরেই মানুষের মনে গেঁথে বসেছে। হঠাৎ লকডাউন ট্রেন, বাস, চলাচল সব বন্ধ। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কর্মরত শ্রমিকরা পায়ে হেঁটে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে বাড়ি ফিরছেন। পথে না পেয়েছেন খাবার না পেয়েছেন পানীয় জল। সেই মর্মান্তিক দৃশ্য চোখে দেখা যায়নি সেদিন। পা থেকে গলগল করে রক্ত ঝরছে। সহস্রাধিক মানুষ কোভিডে নয়, বরং সেদিনের সরকারের অপরিকল্পিত অমানবিক সিদ্ধান্তের জন্য প্রাণ হারিয়েছিলেন। 

অফিস ,আদালত ,স্কুল, কলেজ, লাইব্রেরি, ট্রেন, বাস, বাজার, দোকান সব বন্ধ। নির্দেশ এলো মুখোশ পরে রাস্তায় বেরুতে হবে। সকলের সাথে সকলে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। আমরা মনে করেছিলাম সেদিন সামাজিক দূরত্ব কেন, বরং বলা হোক দৈহিক দূরত্ব  বজায় হোক। মানুষ স্বাস্থ্য সম্বন্ধে একটু সচেতন হোক।

তারপর করোনা তাড়াতে  নির্দেশ এলো ঘন্টা, বাদ্য বাজাও। অমিতাভ বচ্চন বাবুকেও দেখলাম ঘন্টা বাজাতে। আরো অনেকেই সেই বালখিল্য নির্দেশ মেনেছিলেন। আবার আমার মত দেশের বেশিরভাগ মানুষই আবার সে নির্দেশ মানে নি বরং হেসেছিলাম। লজ্জা হয়েছিল আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রীর সেই বোকা বোকা নির্দেশের ফরমান শুনে। কেন অবৈজ্ঞানিক নির্দেশ মানুষ মানবে? ওই নির্দেশের তো কোন বিজ্ঞানসম্মত যুক্তি সত্যিই ছিল না। আজকের সভ্য সমাজে কেউ যদি সকলকে খাঁকি হাফ প্যান্ট পড়তে নির্দেশ দেন,  তাহলে কী সকলে তা মেনে নেব? 

-না কখনোই মানব না। 

এরপর কোটি কোটি টাকা খরচ করে টিকা তৈরির উৎসব শুরু হলো। সে উৎসবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সাথে আমরাও অংশ নিলাম। এরই মধ্যে প্রতিদিন কানে আসছে করোনা হু হু করে বাড়ছে। বিভিন্ন শহরে মানুষ করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছেন। এরই মধ্যে দেখা গেল করোনা নয় এমন মৃত্যুকেও করোণায় মৃত্যু বলে চালিয়ে দেওয়া। বেসরকারি হাসপাতালের ব্যবসার রমরমা।

টিকা তৈরি হলো, ছাড়পত্র এলো। ধীরে ধীরে বিভিন্ন পর্যায়ে সরকার টিকা দেওয়া শুরু করল। লকডাউন এরই মধ্যে কয়েকবার কিছুটা শিথিল হলো। কিন্তু বহু মানুষ এই লকডাউনের কারনে কর্মহারা হলেন, ঋনে জর্জরিত হলেন। অনেকের প্রচুর ক্ষতি হলো ব্যবসা বন্ধ থাকায়। অনেক মানুষ লকডাউন চললেও মৃত্যু ভয়কে উপেক্ষা করে কাজে যোগ দিতে শুরু করলেন। দোকান বাজার একটু একটু করে খোলা শুরু হলো। ট্রেন , বাস যখন চলতে শুরু করল তখন ৩০ বৎসরের উর্দ্ধে সকলের প্রায় দ্বিতীয় ডোজ টিকাকরন হয়ে গেছে। 
ট্রেন, প্লেন, বাস, জলপথ পরিবহন স্বাভাবিক হলো। দোকান বাজারে আবার আগের মতোই খুলতে শুরু করলো। সরকারি উদ্যোগে মেলা , উৎসব, মচ্ছব সব শুরু। 

অথচ শিক্ষাঙ্গন বন্ধ। 

স্কুল-কলেজ খোলা যাবে না। কারন স্কুল-কলেজ খুললেই নাকি ছাত্রছাত্রীরা করোনা আক্রান্ত হবে। ওদের টিকা দেওয়া এখনো হয়নি। 

এর মধ্যে কী ঘটল? 

গত দুবছর স্কুল , কলেজ বন্ধ ছিল ঠিকই তবে অনেক শিক্ষক -শিক্ষিকা এই সুযোগে নিজের পছন্দের স্কুলে বদলি নিলেন। এই বদলি হবার কারনে অনেক স্কুলই এখন শিক্ষক শূন্য হয়েছে। কারন এই সময়কালে সরকার নতুন কোন  শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষা তো নেয় নি। ফলত নতুন শিক্ষক নিয়োগ ও হয়নি। 

এদিকে দুয়ারে স্কুল মানে পাড়ায় পাড়ায় স্কুল চালু করার মত অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত সরকার নিল। খুব স্বাভাবিক কারণেই রাজ্য জুড়ে সরকারের এই অযৌক্তিক সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করলেন ছাত্র, শিক্ষক ও অভিভাবকরা। আমরা বুঝে গেলাম আসলে সরকার চায় এপ্স নির্ভর শিক্ষা, অনলাইন শিক্ষা। এতে সরকারের খরচ কমবে। আবার এপ্স কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে বাঁকা পথে নেতা-মন্ত্রীদের পকেট ভরবে। 

সরকারের এই চক্রান্তের  বিষয়ে হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলা হলো।  মামলার এখনো নিষ্পত্তি হয় নি। 

সরকার কিছুটা পিছু হটলো।

এখন শুনছি মার্চ মাস থেকে নাকি বিশেষজ্ঞদের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে আমাদের রাজ্য সরকার স্কুল খোলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে(জনৈক ডাক্তারবাবুর কথায়)। 

যদি সত্যি মার্চে স্কুল খোলা হয় তাহলেও প্রশ্ন এটাই যে, আগের মত স্কুলে পঠনপাঠন কি সম্ভব হবে স্কুল খুললে? আমাদের সন্তানরা (বাংলা মিডিয়াম) কী প্রকৃত শিক্ষা অন্য রাজ্যের স্কুলগুলির মত পাবে ?

কেন করছি এই প্রশ্ন?

এই প্রশ্ন এই কারনে করছি-----

প্রথমত:-অনেক স্কুলেই বিভিন্ন বিষয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকারা গত ২ বছরে অবসর নিয়েছেন। আবার গত কয়েক বছর ধরেই সরকার স্কুল শিক্ষকের জন্য পরীক্ষা(SSC) বন্ধ রেখেছে। ফলে অনেক স্কুলই শিক্ষক শূন্য।

দ্বিতীয়ত: পছন্দের অন্য স্কুলে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বদলি নেওয়ার হিড়িক লক্ষ্য করেছি গত দুই বছরে। 

কেন লিখলাম এসব?

 এসব লিখলাম এই কারনে যে সরকারের কানে বিশিষ্ট জনের মাধ্যমে কথাগুলি পৌঁছাক। আমার বন্ধুদের মধ্যে অনেকেই সরকার ঘনিষ্ঠ আছেন বুঝি বা উচ্চপদে চাকুরী করেন। 

সবশেষে একটি কথাই লিখব। স্কুল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব খুলুক । এই লকডাউন সময়ে আমি বাংলার বাইরে বেশ কয়েকবার গেছি। (উড়িষ্যা, অন্ধ্রপ্রদেশ ও কর্ণাটক) ওইসব রাজ্যে গত বছর দেখেছি পুরো দমে পঠনপাঠন শুরু করা হয়েছে নির্দিষ্ট পরিকল্পনা করেই। রাস্তায় প্রচুর স্কুল বাসে ছাত্রছাত্রীদের স্কুলে যেতে দেখেছি। অনেককে সাইকেল বা পায়ে হেঁটে স্কুলে যেতে দেখেছি।

একমাত্র ব্যতিক্রম আমাদের রাজ্যে। এরাজ্যে টানা স্কুল বন্ধ ২০২০,২৪ শে মার্চ থেকে। 

ওইসব রাজ্যের সরকার শিশুদের করোনা হোক তা কি চায় এ প্রশ্ন মনে একবারও আমার আসেনি। কারন ওই রাজ্যগুলির সরকার অনেক বিচক্ষণ ও শিক্ষানুরাগী। কর্ণাটক আমাদের রাজ্যের থেকেও উচ্চশিক্ষায় অনেক এগিয়ে বোধহয়। 

এখন অনুরোধ--

স্কুল খুলুন মাননীয়া । 
অনলাইন এপ্স নির্ভর পড়াশুনা আর যাই হোক, গ্রাম বাংলার ছাত্রছাত্রীরা পেরে উঠবে না। হাঁ এটা সত্য ভোটের স্বার্থে আপনি অনেক ছাত্র-ছাত্রীর হাতে 10000 টাকার মোবাইল তুলে দিয়েছেন। 

সত্যি বলছি, সে মোবাইল পড়াশুনার স্বার্থে নয় বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রী অনলাইন গেম আর সিনেমা দেখার কাজেই ব্যবহার করে।

২৯ শে জানুয়ারি,২০২২
#প্রাণকৃষ্ণমিশ্র

Comments

Popular posts from this blog

বর্ধমান জেলার অনেক মানুষের সাথে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের ছিল নিবিড় যোগাযোগ

সাগরপাড়ের রানী ভাইজ্যাক

ডোডোর কেরামতি