সেই রাতে

না কোন ভাইরাস দেখছি না, কাউকে দেখাচ্ছিও না। 

বরং একটা পাহাড়ি যাত্রাপথের ছোট্ট গল্প শোনাচ্ছি আপনাদের। 


সেদিন তোসকায় পৌঁছেছিলাম মেঘ ভাঙা বৃষ্টি মাথায় নিয়ে। ইয়াকসাম থেকে সকাল সাতটায় হাঁটা শুরু করে প্রায় ২১ কিমি পথ হেঁটে যখন তোসকায় আমরা পৌঁছাই তখন প্রায় সন্ধ্যা ৬ টা বাজে। একদিকে পথক্লান্তি অন্যদিকে বৃষ্টির প্রকোপ।  পুরো রাস্তাটি হাঁটতে হাঁটতে বেশ কয়েকবার জোঁকের কামড় খেয়ে নাজেহালও হয়েছি। কিন্তু সব কষ্টকে ভুলিয়ে দিয়েছে এ পথের স্বর্গীয় সৌন্দর্য। পাইন আর রোডড্রেনড্রনের ছায়ামাখা পথে এ পথে যিনি জাননি গল্প পড়ে মানসনয়নে সে পথের সৌন্দর্য অনুধাবন করা বড়ই কঠিন। 

                    আমাদের তাঁবু


আমরা সেদিন বাকহিমে পৌছালাম যখন তখন  সহযাত্রীরা বললেন আজ এখানেই তাঁবু ফেলা হোক। কিন্তু বেগড়া দিলেন একজন পোর্টার। বিড়ি খেতে খেতে উনি  বললেন এখানে অতীতে অনেকবার ভৌতিক বিভিন্ন কান্ডকারখানার সাক্ষী হয়েছেন অনেক পর্যটক। ওনার কথা শুনে আমার সেসময় বেশ মজাই হয়েছিল। ভুত দেখার ইচ্ছাও প্রবল ভাবেই মনে নাড়া দিতে লাগল। 

                        তোসকা


ভাবলাম ট্রেকিং করতে এসে ভুতের দেখা মিললে ক্ষতি কি?  এ তো আনন্দের। জীবনে কোনদিন সাক্ষাৎ ভুতের দেখা পায়নি, ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে এখানেই সেই ভুতের দেখা পাব।বেশ ভালোই হবে।

কিন্তু আমার অন্য একজন সহযাত্রী ভুতের কথা শুনে  বেঁকে বসলেন। তিনি বললেন এখানে থাকব না প্রাণ দা । এগিয়ে চলো, এমনিতেই এখানে গা ছমছম করছে।


অগত্যা সিদ্ধান্ত নিলাম তোসকা পর্যন্তই  আজ হাঁটব।

           পথ চলা অজানা পথে


সেদিন তোসকা পৌঁছিয়ে  দ্রুত তাঁবু ফেলে আমরা একটি তাঁবুতে সকলে  বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। হঠাৎই সন্ধ্যা ৮ টা নাগাদ কেমন যেন গা ছম ছম করে উঠল। তাঁবুর চেনটা খুলে অন্ধকারের দিকে মুখ বাড়িয়ে কাউকে দেখতে না পেয়ে আবার তাঁবুর চেন লাগিয়ে দিলাম। 

কিছুক্ষন চুপচাপ বসে আছি। 

এবার রাজুর কন্ঠস্বর ভেসে এলো। 


-সাবজি খানা তৈয়ার হ্যায়। আইয়ে খা লিজিয়ে। নেহি তো  খানা ঠান্ডা হো জায়গা।


সে সময় তাঁবু থেকে বেরুতেই ইচ্ছা করছে না, এত ঠান্ডা। দাঁতে দাঁত লেগে যাচ্ছে। 

এদিকে ক্ষীদেও পেয়েছে। 

রাতের আহার বলতে আজ রাইস আর শুকনো মাংস রান্না হয়েছে। 


যাই হোক। খাওয়া দাওয়া সকলে যে যার তাঁবুতে  প্রবেশ করে ঘুমের রাজ্যে পদার্পনের তোড়জোড় শুরু হলো। 

এরই মধ্যে রাজু বলে গেল, আগামী কালও বৃষ্টি চলবে। হয়ত আগামী কাল জংরি যাওয়া সম্ভব হবে না। রাজু আমাদের গাইড। ইয়াকসামেই বাড়ি। 

                  বিশ্রামের ফাঁকে

             

সেদিন তোসকার প্রথম রাত বাসর রাতের মত আনন্দদায়ক ছিল না। সারারাত ধরে বৃষ্টি আর ঝড়ো হাওয়ার  তান্ডব চলেছিল। মাঝে মাঝে তাঁবু থেকে পাহাড়টাকে ভয়ঙ্কর দৈত্যের মত লাগছিল। ঝড়ের তান্ডবকে মনে হচ্ছিল সেই দৈত্য স্বরূপ পাহাড়টার হুঙ্কারের মত। 

সকলেই ঘুমিয়েছে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি রাত ১২ টা বাজে। এদিকে মুষল ধারে বৃষ্টির সঙ্গে পাহাড়ি ঝড়ের তান্ডবও উত্তরোত্তর বাড়ছে। 

 মনে হচ্ছে যেন আমাদের তাঁবুটাকেই  গিলে খেয়ে নেবে ওই দৈত্যটা। 


কিন্তু না, হিমালয় দৈত্য হবে কেন? এমন ভাবনা সাময়িক আমার মনের ভ্রম। হিমালয় তো আমার স্বপ্নের শান্তির আশ্রয়স্থল। যেখানে গেলে আমি শান্তি পাই। এত শান্তি আমি অন্য কোথাও পাইনি। 

অনেক মন্দিরে ,মসজিদে, চার্চে, গুরুদুয়ারে গেছি কিন্তু হিমালয়ের মত এত শান্তি আমি কোথাও পাইনি। আমায় যেন সন্তানের মত আপন করে নেন গিরিরাজ বারবার প্রতিবার। আমি হারিয়ে যাই। আমার আমিকে একমাত্র খুঁজে নিতে সক্ষম হই হিমালয়েই। 


রাত্রি তখন দুটো বাজে। রুকস্যাকের ভিতর থেকে বেরিয়ে  হাতঘড়িতে এবার চোখ রাখি। এখনও অনেকটা রাত । এদিকে ঘুম ও আসছে না। গতকাল দীর্ঘপথ চলার কারনে প্রচুর এনার্জি লস হয়েছে সেই কারনেই ঘুমের ব্যাঘাত হচ্ছে। তাছাড়া পায়ে হাতেও ভীষন ব্যাথা। রাতে শোবার সময় প্যারাসিটামল ট্যাবলেটটি খাব ভেবেও খেতে ভুলে গেছি। আসলে সে সময় খাবার ক্ষমতাও ছিল না। 


হঠাৎই তাঁবুতে কেউ যেন ঠোকা দিল মনে হচ্ছে। 

আরো কিছুক্ষন কান খাড়া করে সেই শব্দের অনুভূতি গ্রহণের চেষ্টা করলাম। 

হাঁ কেউ যেন তাঁবুতে ঢোকার চেষ্টা করছে। 


- কে কে ওখানে? কৌন হ্যায়?


কোন সাড়া পেলাম না। আবার কিছুক্ষন গুপটি মেরে শুয়ে রইলাম । ভাবলাম এত রাতে কে আবার আসবে। পাশের তাঁবু থেকে আমার অপর  দুই সহযাত্রীর নাকের শব্দ পাচ্ছি। 


ভয় হচ্ছে, আবার সেই শব্দ। খস খস , খস খস........। 

এবার একটু ভয় হলো। এ জঙ্গলে চিতার অবাধ বিচরণ। ভল্লুক, শ্বাপদের আনাগনা ও কম নয়। 

তাহলে কি........ ?? 


রুকস্যাকের মধ্যে ঘাপটি মেরে শুয়ে কান খাড়া করে সেই  আগত শব্দকে অনুসরণ করছি । শব্দের গতি প্রকৃতির অনুসন্ধান করছি  অনুভূতির উপর ভর করে । একটা অজানা আতঙ্ক, তাও আবার এই জনমানব শূন্য গভীর অরণ্যে। এই  কাঞ্চনজঙ্ঘা জাতীয় উদ্যান ভারতবর্ষের অন্যতম এক গভীর জঙ্গল। 


এরই মধ্যে রাজীবের রুকস্যাকে দুবার হাতে করে ঠেলেও সাড়া পাওয়া গেল না। রূকস্যাকের চেন আটকিয়ে রাজীব গভীর নিদ্রায় নিমগ্ন। ওর ঘুম ভাঙাতেও খারাপ লাগছে, আবার আসন্ন বিপদের পূর্বাভাস পেয়ে সকলকে যদি এই সময়ে না ডাকি তাহলেও বিষয়টা সঠিক হবে না। আমাদের টিমের অন্য দুজন সহযাত্রী আমাদের তাঁবুতে নেই। ওরা কিছুটা দূরে অন্য একটি তাঁবুতে আছে। অনেক রাত পর্যন্ত বকবক করেছে। বুঝলাম সেই কারণেই ওদেরও ঘুম ভাঙছে না। এরই মধ্যে ততক্ষনে রুকস্যাকের মধ্যেই আমি ঘেমে স্নান করে গেছি। রুকস্যাক থেকে বেরিয়ে বসে আছি আর ভাবছি কি করব। এরই মধ্যে নাম না জানা পাহাড়ি কোন নিশিপাখি কর্কট স্বরে ডেকে আমাদের তাঁবুর পাশ দিয়ে উড়ে গেল। 


পায়ের কাছে রাখা জলের বোতলটি খুলে গলাটা ভিজিয়ে নিতেই দাঁতটা কনকন করে উঠল। হয়ত আর কিছুক্ষন পরে জল খাবার ইচ্ছা হলে সে বোতলে জল পেতাম না। কারন বোতলের জল মুখে দিয়ে বুঝলাম তা বরফে পরিণত হবার পূর্ব মুহূর্তের অবস্থায় আছে। 


আবার তাঁবুতে আঁচড়ানোর শব্দ। এবার কিছুটা জোরেই। 

আমি রাজীবের রুকস্যাকের উপর দিয়েই হামাগুড়ি দিয়ে গিয়ে তাঁবুর চেনটা অল্প খুললাম। নিকষ কালো অন্ধকারে শুকতারা ব্যতীত অন্য কিছু দেখা গেল না। তাঁবুর চেনটা আরো একটু খুললাম। 

বৃষ্টির তীব্রতা  আরো কিছুটা বেড়েছে। রোডডেনড্রনের পুরু পাতায় বৃষ্টির জল পড়ছে। দীর্ঘক্ষণ এক নাগাড়ে বৃষ্টিতে গাছটি দেখে মনে হচ্ছে সে যেন মাথা নুইয়ে প্রাণভিক্ষা চাইছে ইন্দ্রদেবের পায়ে ধরে। 

  • আমি ট্রেকিং স্টিকটা নিয়ে তাঁবুর বাইরে আসার চেষ্টা করতেই দেখি পেয়ারিলালকে। প্রশ্ন করলাম কি ব্যাপার পেয়ারিলাল? এই বৃষ্টিতে তুই ভিজছিস কেন? কোথায় ছিলিস? 


কোন উত্তর না দিয়েই পেয়ারিলাল গা ঝেড়ে এক লাফে তাঁবুর ভিতরে প্রবেশ করল। আমিও দেরি না করে প্রকৃতির ডাকে দ্রুত সাড়া দিয়ে তাঁবুতে প্রবেশ করে  তাঁবুর চেন আটকালাম। 

                     পেয়ারিলাল

ততক্ষনে মনের ভয় কেটেছে। পেয়ারিলাল আমাদের  বিশ্বস্ত বন্ধু। সেই ইয়াকসাম থেকে দীর্ঘ ২১ কিমি পথ হেঁটেছে আমাদের সাথে। তাঁবুতে প্রবেশ করে দেখলাম পেয়ারিলাল সারা রাত্রি বৃষ্টিতে ভিজে থরথর করে কাঁপছে। আমি মাথায় যে কাপড়ের টুকরোটি ট্রেকিং এর সময় বাঁধছিলাম সেটি দিয়ে ওর শরীরকে মুছিয়ে দিলাম। 

উফ কি ভয় পেয়েছিলাম এতক্ষন।  পেয়ারিলাল ঘুমিয়ে পড়ল। আমারও ততক্ষনে ঘুম লেগেছে চোখে। রুকস্যাকের চেন আটকে আমিও শেষ রাত্রে ঘুমের রাজ্যে বিচরণ করলাম। 


এখন আর কোন ভয় নেই। আমাদের সঙ্গে এখন আমাদের বিশ্বস্ত বন্ধু পেয়ারিলাল আছে। 

            ওরা সারারাত ভিজেছে


পেয়ারীলালের পরিচয় জানবেন ? 


আসুন এবার পেয়ারিলালের গল্প বলি।


হ্যালো বন্ধু,আমি  পেয়ারিলালের গল্প বলছি। পেয়ারিলাল একটি পাহাড়ি সারমেয়। পেয়ারিলালের নামকরণ আমরাই করেছিলাম। ওর সাথে পরিচয় ইয়াকসামের একফালি চায়ের দোকানে। যাস্ট একদিনের পরিচয়, তারপর বন্ধুত্ব তারপর যাত্রা সঙ্গী।  পেয়ারিলাল আমাদের জংরি যাত্রায় এতটাই ভালোবেসেছিল, যা আমি কোন দিন ভুলে যেতে পারব না । 

পেয়ারিলাল সম্ভবত তিব্বতীয়ান ম্যাস্টিভ এর বংশদ্ভুত। অথবা তাও না হলে একটি পাহাড়ি কুকুর। তবে এরা ভীষন সাহসী, প্রভুভক্ত, অনুগত হয়। 

সেবার ইয়াকসাম থেকে জং রি যাবার পথে দীর্ঘ 50 কিমি গভীর জঙ্গলে পেয়ারিলাল আমাদের সঙ্গে ছিল। আগের দিন রাত্রে ইয়াকসাম ট্রেকার্স হাটে ওকে একটা ডিম, দুটি বিস্কুট আর একটু ভাত খাইয়েছিলাম। তাতেই পেয়ারিলাল আমাদের বন্ধু হয়ে যায়। 


ইকো টুরিজিম বা ট্রেকিং এর সাথে যাঁরা যুক্ত তাঁরা প্রত্যেকেই জানেন এদের বিশ্বস্ততা। হিমালয়ের গভীর জঙ্গলে চিতা, কালো ভাল্লুক, সাদা ভাল্লুক, বিভিন্ন ভয়ঙ্কর সাপ থাকেই। এরা অনেক সময় পর্বত আরোহীকে বিপদে ফেলে। কিন্তু সেবার আমাদের পোর্টাররা বললেন এই পেয়ারিলালরা সাথে গেলে কিছুটা বিপদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

আমরাও তার প্রমান পেয়েছি। হঠাৎ দেখি পেয়ারিলাল হাঁটতে হাঁটতে বনের দিকে রুদ্ধশ্বাসে ছুটে গেল, আবার কিছুক্ষন পর ফিরে এলো। 

আবার কখনো নাক উঁচু করে কিছু একটা দাঁড়িয়ে শুকতে লাগল। গাইড বলল একটু দাঁড়িয়ে যাই , দাঁড়ান। পরে জিজ্ঞাস করায় বলল সাপ, বা ভাল্লুক আছে কাছাকাছি। বর্ষা কাল এসময় জঙ্গলে খাদ্যের একটু অভাব থাকে । কাঞ্চনজঙ্গা জাতীয় উদ্যান সত্যই রোমাঞ্চকর।


আমাদের সহযাত্রীর কেউ একটু একাকী পিছিয়ে গেলে দেখেছি পেয়ারিলাল ছুটে গেছে তার কাছে। আবার তাকে সঙ্গে নিয়ে মূলটিমের সাথে তাকে যুক্ত করে নিয়েছে। প্রবল বৃষ্টিতে ও ছিল আমাদের তাঁবুতেই। খেয়েছি, ঘুমিয়েছি, হেঁটেছি একসাথে। সে অপূর্ব এক অভিজ্ঞতা। ভুলতে পারিনি পেয়ারিলালকে। কোন দিন ভুলতেও চাইনা।


যাই হোক গল্পটি পড়তে পড়তে প্রথমে ভাবছিলেন হয়ত ভৌতিক কোন গল্প বর্ণনা করছি। ভেবেছেন হয়ত কোন দুর্ঘটনার গল্প শোনাচ্ছি আপনাদের। কিন্তু তা নয়। আমি পেয়ারিলালের মত এক বন্ধুর গল্প শোনাচ্ছিলাম এই কারনেই যে আজকের লক ডাউনের সময়ে পেয়ারিলালদের অনেক অসুবিধায় পড়তে হচ্ছে। 


এদের আমরা স্ট্রিট ডগ বা পথ কুকুর বলি। অনেকে ঘৃণা করি, প্রহার করি, এমনকি রেগে গায়ে গরম জল ইত্যাদি দিয়েও এদের বিপদে ফেলি। কষ্ট দিই। আমার বিনীত অনুরোধ এই দুঃসময়ে ওদের অল্প করে খাবার দিন। নয়ত এই লকডাউনের সময় অনেকেই ওরা প্রাণে মরবে। এরাই আপনার বাড়ি, পাড়া পাহাড়া দেয়। বিনিময়ে কোন কিছুর প্রত্যাশা করে না। 

এরা চায় শুধু একটু ভালোবাসা আর সহমর্মিতা। 

ওদের ভালোবাসুন। ওরা প্রতিদানে আপনাকে অনেক অনেকগুন ভালোবাসা ফিরিয়ে দেবে। 


আমায় বিশ্বাস করুন। 

আপনার পাড়ার কুকুর , বিড়ালকে বাঁচিয়ে রাখুন।



©প্রাণকৃষ্ণ মিশ্র






Comments

Popular posts from this blog

বর্ধমান জেলার অনেক মানুষের সাথে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের ছিল নিবিড় যোগাযোগ

সাগরপাড়ের রানী ভাইজ্যাক

ডোডোর কেরামতি