আমার কথা

                          প্রাণকৃষ্ণ মিশ্র


নিম্ন মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান । পিতা সরকারী চাকুরী করতেন।  দু-তিন বিঘে জমিও ছিল। যদিও সেসব আজ ইতিহাস।

গ্রামের বিদ্যালয়ে পড়াশুনা । লেখাপড়ায় কোনদিনই ভালো ছাত্র ছিলাম না । তবে সে সময় গ্রামের দিকে আজকের মত একজন ছাত্রের একাধিক শিক্ষকের ব্যবস্থা কোন অভিভাবকই করতে পারতেন না। অর্থনৈতিক সঙ্গতি সেকালে গ্রামের দিকে অভিভাবকদের তেমন ভালোও ছিল না, থাকলেও সেকালে একাধিক শিক্ষকও ওই গন্ডগ্রামে মিলত না।বাবার চাকুরী দূরবর্তী শহর বর্ধমানে। মাঝেমাঝেই বদলি হয়ে অন্যত্রও যেতে হয় । জেলার বিভিন্ন মফস্বল শহরে চাকুরী।  তাই সপ্তাহে একদিন পিতার সঙ্গে সাক্ষাৎ হতো ।  

          ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা অগাধ। কখনো ক্রিকেট খেলতাম কাপড় দিয়ে তৈরি বলে দিয়ে  তো কখনো রাবারের বলে। তখনও ক্যামবিস বল গ্রাম বাংলা চোখে দেখেনি। শৈশবে ছিল বুড়ি বসন্ত, লুকোচুরি,  হা ডু ডু ডু, ভলি বল খেলার রেওয়াজ।খেলতে ভালো লাগতো ফুটবল। কিন্তু শারীরিক দুর্বলতা সে খেলায় ভয় পেত। টিভি দেখার সুযোগ ছিল না। এই খেলাধুলা আর লেখাপড়া, সঙ্গে একটু তবলা শেখা এই ছিল জীবন। তখন টিভিতে রামায়ন টিভি সিরিয়াল চলছে । গ্রামের এক পরিবারে টিভি এলো। সারা গ্রামের লোকজন একসাথে সেই বাড়ির চাতালে ছোট্ট সাদাকালো টিভিতে সেসব দেখা ছিল প্রতি রবিবারের কাজ।

বাবার বর্ধমান শহরে চাকুরিকালীন সময়ে ভোরে আমরা ঘুম থেকে ওঠার আগেই বেরিয়ে যেতেন। তখন গ্রামের কংক্রিটের রাস্তার অবস্থা খুবই খারাপ, যান চলাচল কম। আবার যেহেতু বাবা আইনের অফিসের কর্মী তাই সকাল ১০ টার মধ্যে অফিস পৌঁছাতে হতো। কিন্তু বাবাকে দেখতাম সকাল ৫ টার বাস ধরতে। তখন আমার গ্রাম থেকে বাসে বর্ধমান পৌঁছাতে বাবার প্রায় ৩ ঘন্টা সময় লাগতো। তাহলে এত আগেই যেতেন কেন?

একদিন প্রশ্ন করায় বললেন- অফিসের প্রচুর দায়িত্ব। বাবা তখন ওই অফিসের পেশকার। তাই হাকিমের উপস্থিতির আগেই ফাইল রেডি করতে হতো। আজকের দিনে এমন নিয়মানুবর্তিতা ও কর্তব্যপরায়ন কর্মী একদম নেই তা নয়। তবে সংখ্যায় অনেক কম। অফিস থেকে ফিরতে বাবার প্রতিদিনই রাত ৮ টা বেজে যেত। আমার গ্রাম থেকে ৫ কিমি দূরে উচ্চালন নামক একটি বাজারে বাবা সাইকেল রাখতেন। কোনদিন যদি আমাদের গ্রামে ফেরার শেষ বাস না পেতেন সেদিন দেখতাম বাবা উচ্চালন থেকে ৫ কিমি অন্ধকার রাস্তায় সাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফিরছেন। আর তখন আমরা চিন্তায় পড়তাম।  কারন তখন আমাদের ওই এলাকায় ডাকাতি, ছিনতাই খুব হতো। অধীর আগ্রহে আমরা দুইভাই সহ সারা পরিবার বাবার বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় পথ চেয়ে বসে থাকতাম। কখনো লন্ঠন নিয়ে গ্রামের পথে তাল গাছটার তলায় গিয়ে দাঁড়িয়েও থেকেছি ।  এমন মানুষগুলির স্মৃতিচারণ করা আজকের দিনে বড্ড প্রয়োজন। সমাজে যেখানে সকলকে স্বার্থপরতা গ্রাস করছে তখন আমার বাবার মত মানুষগুলোকে দেখলে এখনও বেঁচে থাকার ও লড়াই করার প্রেরণা  আসে। 


আউটস্টেশন চাকুরীর সময় সপ্তাহে শনিবার ফিরতেন বাবা। রবিবার থাকতেন বাড়িতে । সেই দিন দেখতাম আমাদের খামার বাড়িতে বাবা কোদাল দিয়ে মাটি কুপিয়ে ফুলকপি, বাঁধাকপি, বিভিন্ন শাক গাছ, টমেটো চারা লাগাতেন। আর সারা সপ্তাহ গাছের পরিচর্যা, জল দেওয়ার দায়িত্ব মার। রবিবার রাত কাটতেই  সোমবার ভোরে ট্রেন ধরে আবার আসানসোল ছুটতেন।বাবা আসানসোলে থাকাকালীন সময়ে সারা সপ্তাহ আমরা বাবাকে পেতাম না। কিন্তু শনিবার বাবা ফিরতেন। তাই শনিবারের জন্য খুব আনন্দ হতো । প্রতিবারই বাবা শনিবার বাড়ি ফেরার সময় এইসময় আমাদের দুই ভাইয়ের জন্য বিভিন্ন খাবার, ফলমূল আনতেন। তখন আমার মেজকাকুর মেয়ে আমাদের একমাত্র বোন ও কিছুটা বড় হয়েছে। ওর বয়স তখন ৫-৬ বছর। আমরা সেই সব ভাগ করে খেতাম তিন ভাইবোন। একান্নবর্তী সংসার। সে সংসারের মজাই আলাদা। যাঁরা একান্নবর্তী সংসারে থাকেন তাঁরা সেই আনন্দ উপভোগ করেন। রবিবার সারাদিন বাবাকে পেতাম। তাই  সকালে বা বিকালে বাবার সাথে বাজারে যেতাম ভালোভালো মিষ্টি, চপ, সিঙ্গারা খাবার লোভে।

তবে বাবা এলে একটু ভয়ও ছিল। কারন আমার ভাই ওই সময় ভীষন দুষ্টু ছিল। দুইভাই সারাদিন মারপিট, ঝগড়া আবার গলা জড়িয়ে ঘুমানো সবই চলতো।  সপ্তাহ শেষে মা সবকিছু  বাবাকে নালিশ করবে ,সেই ভয়ও ছিল। কখনো কখনো দু- এক ঘা মার ও খেয়েছি বাবার কাছে। তাছাড়া পড়াশুনা না করলে তার জন্য শাস্তি তো বরাদ্দ ছিলই।

এই সময়ে আমরা দুইভাই একটু ছিপ নিয়ে মাছ ধরার নেশাতেও পড়েছিলাম। বর্ষাকালে জমিতে শটকা দিয়ে শোল, ল্যাঠা, চ্যাং মাছ ধরতাম। কুড়ো আর ভাত মেখে দুটি কঞ্চির সাথে একটি কাপড় বেঁধে চিংড়ি মাছ ধরতাম রাত্রে।

বর্ষা কালে জমি সংলগ্ন অন্য জনের মাছ ধরার আড়ায়  টর্চ নিয়ে বা লন্ঠন নিয়ে  মাছ চুরিও কম করিনি। শীতের সময় খেঁজুর গাছে রাত্রে উঠে রস চুরি ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। সিধু জ্যাঠা রস থেকে গুড় তৈরি করতেন। আমরা কেউ কেউ অনেক সময় ওই বয়সে ওনার রসের হাঁড়ি থেকে রাত্রে রস খেয়ে একটু হিসু করে হাঁড়িও ভর্তি করে রেখে আসতাম।  কারন রসের রঙ আর হিসুর রঙ প্রায় এক। জ্যাঠা ধরতে পারতো না, তাই এমন অনৈতিক কাজ করেছি।পরে বাড়ি এসে মায়ের কাছে বকুনি, মার খাওয়া ছিল নিত্য ঘটনা। কারন মা এসব অনেক ঘটনাই পরে জেনে যেতেন।

এইভাবেই গ্রাম্য পরিবেশে শৈশবটা কাটে। সবই হয় লেখাপড়াটা মন দিয়ে হয় না। বাবা চিন্তায় পড়েন। কদিন চলবে এইভাবে। গ্রামে থাকলে পৈতৃক জমিজায়গা যেটুকু ছিল তা হয়ত দেখাশুনা করতে পারতাম কিন্তু ভবিষ্যৎ ভালো হতো না। 

তাই বাবার ইচ্ছায় সে গ্রাম ছেড়ে একদিন চলে আসতে হলো সুদূর কালনায় গঙ্গাতীরে। 

কালনায় এসে কালনা মহারাজা উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণীতে ভর্তি হলাম। প্রথম প্রথম নিজেকে মানিয়ে নিতে খুবই কষ্ট হচ্ছিল। ধীরে ধীরে সময়ের সাথে সব ঠিক হয়ে গেল। 


১৯৯২ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষা দিই। খুব ভালো ফলাফল না হলেও খুব খারাপ ও হয় নি। তারপর উচ্চ মাধ্যমিক। ১৯৯৪ সালে উত্তীর্ন হয়ে কালনা কলেজে বাণিজ্যে অনার্স নিয়ে ভর্তি। এই সময় বাম ছাত্র রাজনীতির সাথে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ গড়ে ওঠা। ১৯৯৭ সালে বাণিজ্যে অনার্স পাস করার পর কয়েকবছর কম্পিউটার শেখা চলে। তারপর চাকুরী জীবনে প্রবেশ। 


প্রথম চাকুরী কলকাতায় একটি সফটওয়ার কোম্পানিতে। কিন্তু সে কাজ কয়েকমাসের মধ্যেই ছেড়ে কালনায় ভোকেশনাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে কম্পিউটারের প্রশিক্ষকের কাজে যুক্ত হই। প্রায় ৩ বছর ভোকেশনালে কাজ করার পর কালনা পৌরসভায় DFID দপ্তরে কমপিউটারের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর পদে নিযুক্ত হই। এই পোষ্টেও ৩ বছর কাজ করেছি। অবশেষে বর্তমানে যে চাকুরিতে আছি সেই কাজে যুক্ত হই ২০০৫ সালে। 


জীবন খাতার প্রতি পাতায় শুধুই হিসাব নিকাশ চলছে এইভাবে। সঙ্গে লেখালেখি। সংসার ধর্ম। রাজনীতিতে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে কয়েকজন দ্বিচারী মানুষের জন্য। যদিও আজও মনে প্রানে বামপন্থায় বিশ্বাস ও আস্থা রেখেছি। 

বাস্তব বড্ড কঠিন। জীবনে চলার পথে খানাখন্দে ভরা। তবুও এগিয়ে যেতে হবে আরো অনেকটা পথ সৎপথে। অন্যায়ের সঙ্গে আপোষ করা স্বভাব বিরুদ্ধ। অনেকের কাছেই কাঠখোট্টা মানুষ। তবুও আমি সব জেনে বুঝেও আমার মত করে পথ চলতে চাই, আমার মত করে বাঁচতে চাই।


Comments

Popular posts from this blog

বর্ধমান জেলার অনেক মানুষের সাথে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের ছিল নিবিড় যোগাযোগ

সাগরপাড়ের রানী ভাইজ্যাক

ডোডোর কেরামতি