উড়তে উড়তে উড়োজাহাজে

উড়তে উড়তে উড়োজাহাজে
প্রাণকৃষ্ণ মিশ্র



উড়োজাহাজে চড়ে  আকাশে উড়ব এ আমি  স্বপ্নেও কোনদিন ভাবিনি। কারন উড়োজাহাজে চড়ে ভ্রমন আমার বিলাসিতা মনে হয়। দেশের বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমনের উদ্দেশ্যে যেখানেই গেছি ট্রেন ,বাস এই দুই মাধ্যমকেই ব্যবহার করেছি।  আমার পূর্বপুরুষরাও আজ পর্যন্ত কোনদিন উড়োজাহাজে চাপেননি। কারন তাঁদেরও উড়োজাহাজে চড়ার প্রয়োজন পড়েনি। সত্যি কথা বলতে কি ট্রেনে বাসে বা ব্যক্তিগত গাড়ি ভাড়া করে ভ্রমনেই আমি চিরকাল অভ্যস্ত। ট্রেনে বা বাসে চেপে ঘন্টার পর ঘন্টা সময় কাটানো ও ভ্রমনের অঙ্গ, আলাদা মজা। 

শৈশবে গ্রামে থাকতাম। মনে পরে শৈশবে ডাবগাছের বা তালগাছের পাতার উপর বসে আমরা গাড়ি গাড়ি খেলতাম। সে গাড়িতে কখনো আমি যাত্রী হতাম তো আমারই কোন বন্ধু গাড়ির চালক হতো। এক হাতে করে সেই গাছের পাতাটিকে ধরে মোরামের রাস্তা দিয়ে উর্ধশ্বাসে  ছুটতে হতো। যে বসে থাকতো তার আরাম হতো ঠিকই, কিন্তু  যে পাতাটিকে ধরে ছুটত তার প্যান্ট হলুদ হতো। আমি বরাবরই রোগাসোগা ছিলাম। তাই আমি যখন টানতাম তখন এক হাতে প্যান্ট ধরে অন্য হাত দিয়ে গাছের ডালটিকে ধরে ছুটতাম। কারন অনেকবার এমন হয়েছে কিছুটা দৌড়ানোর পর প্যান্ট খুলে যেত। 

তারপর একটু বড় হতেই কামার বাড়িতে গিয়ে লোহার রিং তৈরি করে অথবা সাইকেলের টায়ার নিয়ে একটি লাঠির মাধ্যমে চালাতাম। গাড়ির প্রতি অর্থাৎ গতির প্রতি আকর্ষণ সেই সময় থেকেই। 

শৈশবে গরুর গাড়িতেও খুব চড়েছি। 
আমাদের বাড়িতেও গরুর গাড়ি ছিল সেকালে। সে সময় প্রায়ই স্বপ্ন দেখতাম  আমিও গরুর গাড়ি চালাব।  আসলে গরুর গাড়ির পিছনে বসে থাকতে একদম মন চাইতো না। তারপর একদিন সত্যি সত্যি গরুর গাড়ির ড্রাইভার হয়ে গিয়েছিলাম। 

যাই হোক প্রসঙ্গে আসি। ছোট বেলায়  আমাদের মাটির বাড়ির ছাদ দিয়ে মাঝে সাজে উড়োজাহাজ যেতে দেখতাম। তখন থেকেই উড়োজাহাজে চড়ার স্বপ্ন মনে মনে দেখতে শুরু করি। সে বয়সে মনে  কত প্রশ্ন উঁকি দিত। 
 কে চালায় এই উড়োজাহাজ? 
এই উড়োজাহাজে  কারা চাপে, কতজন বসতে পারে, উড়োজাহাজ কত বড় হয়?
যারা ভিতরে আছে তাদের পটি পেলে তখন কি করে? 
এইসব বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে ভাবতাম যদি এই সময় কেউ পটি করে আর তা আমার মাথায় পড়ে যায় তাহলে কি বাজে ব্যাপার না হবে। 
সেই ভয়ে কখনো কখনো উড়োজাহাজ  মাথার উপর দিয়ে আকাশ পথে গেলে একটু সরে দাঁড়াতাম। তবে সরে দাঁড়ালেও মনে হতো মাথার উপরেই আছে।

 একটু বড় হতে সব প্রশ্নের উত্তর পেলাম। উড়োজাহাজেও আছে ট্রেনের মত বাথরুম । একটু বড় উড়োজাহাজে প্রায় ৬০০ জন লোক বসতে পারে। উড়োজাহাজের ভাড়া সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। উড়োজাহাজের যিনি চালক তাকে পাইলট বলে। যাঁরা যাত্রীদের বিভিন্ন সমস্যায় সহযোগিতা করেন তাদের এয়ার হোস্ট্রেস বলা হয়। এনারাই প্রয়োজনে খাবার পরিবেশন করেন। 
তবে উড়োজাহাজে চড়ার আগে ঝক্কি ঝামেলা প্রচুর। বিশেষত আমাদের মত লোকজনদের যাঁরা স্মোকিং করেন। সিগারেট বিড়ি লুকিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হলেও দেশলাই বা লাইটার পকেটে নিয়ে যাওয়া অসম্ভব। তাই সেদিন আমি লাইটার লাগেজের মধ্যেই রেখে এয়ারপোর্টে প্রবেশ করেছিলাম। 

সত্যি সেদিন খুব ভয় ভয় করছিল। অভিগ্গতা না থাকলে সকলেরই কমবেশি এমন একটু ভয় হয়। সেদিন এয়ারপোর্টে প্রবেশ করেই প্রথম লাগেজ(ব্যাগ) গুলি ওজন করিয়ে প্রথম বৈধ টিকিট পরীক্ষা সম্পন্ন হলো। এরপর আরো বেশ কয়েকবার পরীক্ষা পর্ব সাঙ্গ করে পৌঁছালাম এয়ারপোর্টের ভিতর আর তারপর দীর্ঘ প্রতীক্ষা। এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে কোথাও চোখে পড়ছে না স্মোকিং জোন। এদিকে ততক্ষনে পেট ফুটফাট করছে সিগেরেটের সুখ টানের জন্য। এক ভদ্রলোককে জিজ্ঞাসা করায় তিনিও হাসিমুখে বললেন যে, তিনিও খুঁজছেন। একটু পরই চোখে পড়ল একটি হোটেলের দ্বিতলে একজন বিদেশিনীর ধূমপানের দৃশ্য। তারপর দ্বিতলে ওঠার সিঁড়ি খুঁজে পৌঁছালাম নির্দিষ্ট স্মোকিং জোনে। 
আহা কি সুখ। 
যাই হোক আর বেশি সময় নেই প্লেন ছাড়তে। বারবার ঘোষণা হচ্ছে এয়ার ইন্ডিয়ার ব্যাঙ্গালোরগামী যাত্রীরা কোভিড কিট সংগ্রহ করুন। অবশেষে কোভিড কিট সংগ্রহ করে সারিবদ্ধ হয়ে এগিয়ে চললাম প্লেনের উদ্দেশ্যে। চাপ চাপ টেনশন, সাথে আনন্দ। 
তারপর নির্দিষ্ট চেয়ারে বসলাম। বসার কিছুক্ষন পর এয়ার হস্ট্রেস একজন সিট বেল্ট কোমড়ে জড়াতে বললেন। আরো বললেন যাত্রাপথে অক্সিজেনের স্বল্পতা হলে অক্সিজেন কিভাবে মিলবে ইত্যাদি ইত্যাদি। 
প্লেন ছাড়ল। জানালার দিকে চাতক পাখির মত তাকিয়ে বসে আছি। কিন্তু রাতের ফ্লাইট হওয়ার কারনে তেমন কিছু দেখতে পেলাম না। তবে অনেকটা উপর থেকে শহরের ঝলমলে আলোক রাশিকে দেখতে সত্যিই সুন্দর লাগছিল। প্রায় একঘন্টা উড়ে চলার পর আবার একজন এয়ার হস্ট্রেসের কন্ঠস্বর ভেসে এলো। 

"আবহাওয়া খারাপ সকলে সিট বেল্ট লাগান।"
তারপরই পাইলটের কন্ঠস্বর। উনি প্রথমেই নিজের নাম বললেন। তারপর বললেন আবহাওয়ার জন্য বেশ কিছুটা নিচেই নামতে হবে। 
সত্যি বলছি এই সময় বেশ ভয় হয়েছিল। সেই ভয় আরও বাড়িয়ে দিল যখন ঘের-ঘের, ঘর-ঘর, ধকাম-ধকাম করে বিভিন্ন আওয়াজ কানে আসছিল। মনে হচ্ছিল প্লেন যেন পশ্চিমবঙ্গের কোন গ্রামের এবড়ো খেবরো রাস্তা দিয়ে চলছে। 
আমার সহযাত্রী গৌতম মুখার্জি তো বলেই বসলেন "বাঘনাপাড়া রুটে চলছে নাকি রে?"
যাই হোক কিছুক্ষন এইভাবে যাওয়ার পর শব্দ উধাও হলো। আবার নিজের গতিতে চলতে শুরু করল। 
প্রায় আড়াই ঘন্টার একটু আগে বুঝলাম আমরা ব্যাঙ্গালোর ঢুকছি। এয়ার হস্ট্রেস ও মাইকে বললেন। ঘুমিয়ে থাকা ব্যাঙ্গালোর শহরের আলোগুলি ক্ষীণ হলেই ধীরে ধীরে জানালার কাঁচ ভেদ করে চোখের রেটিনায় পড়ছে। তার কিছুক্ষন পরই রানওয়ে ছুঁয়ে প্লেন ছুটতে ছুটতে থামল। 
তবে সত্যি বলছি যাঁরা প্লেনে এদিক সেদিক যান তাঁদের প্লেন কেমন লাগে জানিনা, আমার কিন্তু একদম ভালো লাগেনি। বড্ড একঘেয়ে । ফেরার সময়ও প্লেনেই ফিরেছি। একদম ভালো লাগেনি। বরং ট্রেনে, বাসে সকলের সাথে কথা বলতে বলতে ভ্রমনের মজাই বেশি বলে আমার মনে হয়েছে। 
তাই সিদ্ধান্ত, খুব তাড়া না থাকলে উড়োজাহাজে আমি আর চাপব না। 

Comments

Popular posts from this blog

বর্ধমান জেলার অনেক মানুষের সাথে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের ছিল নিবিড় যোগাযোগ

সাগরপাড়ের রানী ভাইজ্যাক

ডোডোর কেরামতি