প্রতিবাদিনী //প্রাণকৃষ্ণ মিশ্র
সেইদিন বৃহস্পতিবার। সকাল থেকেই মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। একদিকে লকডাউনের কারনে দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ। আগামী বছরই আমার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা। আমি পারুল।
আমার মন আজ একদম ঠিক নেই। এইভাবে দীর্ঘদিন টিউশনি, স্কুল বন্ধ থাকলে কিভাবে কি হবে? কারই বা মন ঠিক থাকে?
তাছাড়া কতদিন হলো বিজয়ের ফুচকার দোকানেও যেতে পারিনি। তবে ফোন করে বন্ধুর থেকে শুনেছি লকডাউনের কারণে বিজয় দাও দোকান খুলছে না।
এরই মধ্যে মা ডাক দিল - পারুল আয় মা একটু আলতা পরিয়ে দিই, আজ গুরুবার।
আমি রেগে গিয়ে বললাম ,মা জানোই তো আমি আলতা পরতে পছন্দ করি না। তাছাড়া আলতা পড়লে আমার পা চুলকায়, এলার্জি হয়।
মা বললেন , সে কি রে। তুই বামুনের ঘরের মেয়ে। আলতা পরবি না বললে হয়? লোকে কি বলবে?
তাছাড়া আগামী বছরই আমরা তোর বিয়ে দেব। একপ্রকার পাকা কথা প্রায় হয়েই রয়েছে। ছেলেটাও ভালো শুনেছি।
---- বিয়ে আমি করব না মা এখনই। আমি পড়াশুনা করব। দীপিকাদির মত চাকুরী করব। আমি নার্সিং পড়ব মা। অসুস্থ রুগীদের সেবা করব। আমাদের দেশে এই অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দিয়েই সব শেষ করে দিচ্ছ তোমরা। সবে আমার এখন বয়স ১৭ বছর। এই বয়স থেকেই নয় নয় করে ৫ বার ছেলে দেখাশুনা করেছ। আর বলিহারি , তাঁরাও সব জেনেশুনে ড্যাং ড্যাং করে আমায় দেখতে চলে আসে।
শোন ,আমি পড়াশুনা করব। উচ্চমাধ্যমিকের পর নার্সিংয়ে ভর্তি হবো।
দয়া করে আমার স্বপ্নকে তোমরা ভেঙে দিও না। দাদার বয়স ৩৪ বছর। এখনো তো তার বিয়ে দিলে না?
বরং আগে তাঁর জন্য একটা বউ নিয়ে এসো। আমি এত তাড়াতাড়ি বিয়ের পিঁড়িতে বসতে পারব না। আর শোন যদি বেশি চাপাচাপি করো তাহলে আমি থানায় গিয়ে তোমাদের নামে নালিশ ঠুকব বলে দিলাম।
মা রেগে যায়।
কি বলিস পারুল? তুই থানায় যাবি? আমরা কিনা তোর ভালো চাইছি আর তুই কিনা বলিস থানায় যাবি?
------হাঁ মা থানায় যাব। আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধ্যে তোমরা জোর করে কিছু করতে পারো না। আগামী বছর আমি উচ্চমাধ্যমিক দেব। তার পরে আমি নার্সিং পড়ব। তাঁর জন্য আমি পড়াশুনাও শুরু করেছি। আজ আমার খুব মনে আসছে যে তোমাদের মত অভিভাবকের জন্য কত শত স্বপ্ন বাষ্পের মত উড়ে যায় আকাশে। অল্প বয়সে কত মেয়ে লেখাপড়া ছেড়ে সংসার যন্ত্রনায় পদার্পন করে।
দ্বিতীয় অধ্যায়
পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠলাম। আমার কানে সেই মায়ের কথাগুলি অহরহ বেজে ওঠছে। সকাল ১০ টার সময় লকডাউন সত্বেও মুখ ঢাকার মাস্কটি পড়ে আমি প্রথমে গেলাম গঙ্গার তীরে বকুল গাছটির তলায়। এই জায়গাটি আমার চরম তৃপ্তির জায়গা। এখানে এলেই আমি মনে শান্তি পাই। কিন্তু আজ কেমন যেন হচ্ছে। এখানে বসে থাকতেও মন চাইছে না। একটা যন্ত্রনা আমার হৃদয়কে চূর্ণ বিচূর্ণ করছে। পড়াশুনা ছেড়ে এই বয়সে বিয়ে? তাছাড়া এ বিয়েতে আমার মতামতের কোন মূল্য থাকবে না? মা বাবা যা বলবেন তাই শুনতে হবে? যাকে বলবেন তাকেই বিয়ে করতে হবে?
না ,এ সম্ভব নয়। সাইকেল চালিয়ে গেলাম কোচিং স্যারের বাড়ি। এটুকু পথও যেন মনে হচ্ছে কয়েক ক্রোশ। সাইকেলের চাকা যেন ঘুরতেই চায় না। এদিকে ক্ষীদেও পেয়েছে। স্যারের বাড়ি পৌঁছে, স্যারের সাথে কথা বলার ফাঁকেফাঁকে তখন কেমন যেন উদাস হয়ে পড়ছিলাম।
স্যার জিজ্ঞাসা করলেন কি হয়েছে পারুল? আজ তোমায় বড় বিষন্ন লাগছে?
-----না স্যার, তেমন কিছু নয়। তবে…..
তবে কি ? বলো। আমি তোমার দাদার মত।
--- স্যার, বাবা আমার বিয়ের ঠিক করেছেন। কিন্তু আমি এখনো পড়তে চাই। নিজে কিছু করতে চাই। আমার ভীষণ ইচ্ছা আমি নার্সিং পড়ব। কিন্তু .....
কিন্তু আবার কি? তোমার যদি পড়ার ইচ্ছা থাকে কেউ তোমাকে আটকাতে পারবে না। যদি বাড়িতে সমস্যা হয় আমার বাড়িতে থাকবে। আমি যে তোমাকে বড় ভালোবাসি।
-- সত্যি স্যার? আজ আমার মাথা থেকে চিন্তা দূর হলো। আমি ভীষণ আনন্দ পেলাম। শান্তি পেলাম মনে। দেখবেন আমি উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করব। নার্সিং এ ও চান্স পাব। আমার স্বপ্ন সত্য হবেই। স্যার এখন আমি বাড়ি যাই।
টাটা….
তৃতীয় অধ্যায়
এরপর দেখতে দেখতে কখন একটা বছর পেরিয়ে গেল। এরমধ্যে অনেকবার মা বিয়ের কথা তুললেও আমি তেমন একটা আমল দিই নি সে কথায়। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় বিজ্ঞান শাখায় সব বিষয়ে৮০% নম্বর পেয়ে আমি উত্তীর্ণ হলাম। তারপর আমার স্বপ্নের নার্সিং পরীক্ষাতেও পাশ করলাম। পরীক্ষার পর ছেলের বাড়ির লোক যোগাযোগ করলে বাবা একপ্রকার প্রায় বিয়ের দিন ঠিক করে ফেললেন। আমি জানালাম এখন বিয়ে করব না। নার্সিং এ পাশ করেছি, নার্সিং কমপ্লিট না করে বিয়ে করা সম্ভব না।
এদিকে মা বাবা নাছোড় বান্দা বিয়ের জন্য। আমি রাগারাগি করে সেই রাত্রেই চলে গেলাম স্যারের বাড়ি।
--- স্যার আছেন ? দরজা খুলুন।
কি ব্যাপার পারুল এত রাত্রে তুমি? রাত১০ টা বাজে।
----- আগে ভিতরে চলুন। তারপর সব বলছি। আচ্ছা, স্যার আপনার মনে আছে একদিন আপনি বলেছিলেন যে, নার্সিং পড়তে চাইলে আপনি আমায় পড়াবেন ?
হাঁ, তা তো মনে আছে। কিন্তু কি হয়েছে বলো ?
------স্যার। আমি পড়তে চাই। তাই আপনাকে আজ আপনার কথার মর্যাদা দিতে হবে। আমার লেখাপড়ার সব দায়িত্ব আগামী ৫ বছরের জন্য আপনাকে নিতে হবে। আমি বর্ধমান মেডিকেল কলেজে নার্সিং পড়ব। কিন্তু তাঁর আগে আপনাকে আর একটি কাজও করতে হবে। বলুন পারবেন?
স্যার বললেন , হাঁ পারুল বলো। একজন ছাত্রীর লেখাপড়ার জন্য আমি সব রকম সাহায্য করব, তাঁর পাশে দাঁড়াব এ আর এমন কি ব্যাপার?কোন ছেলেমেয়ে অর্থের জন্য পড়াশুনা করতে পারবে না তা হয় না । সমাজে কেউ না কেউ তাঁদের পাশে দাঁড়াবেই। আমিও তোমার পাশে আছি।
------ স্যার আপনার বাড়িতে থেকেই আমি পরবর্তী লেখাপড়া করতে চাই। কারন ওই বাড়িতে গেলে আমার সব স্বপ্ন শুষ্ক মরুভূমিতে পরিণত হবে। আমি মাথা উঁচু করে বাঁচতে চাই স্যার। তবে একটা কথা……
বলো কি বলতে চাও।
-------- স্যার আমি আর ওই বাড়িতে ফিরতে চাইনা। আপনার বাড়িতে থাকতে হলে আপনাকে আমাকে বিয়ে করতে হবে। আমি অনেক দিন থেকেই আপনাকে মনে মনে ভালোবাসি। কিন্তু কোনদিনও বলতে পারি নি। আপনি আজ রাত্রেই আমাকে বিয়ে করুন। তবেই সম্ভব এ বাড়িতে থেকে আমার পড়াশুনা করা।
নয়ত আমি গঙ্গায় ডুবে মরব।
এ কি বলছ পারুল। তা কি করে সম্ভব? এসব বলতে নেই।
দেখো আমি নিজেও এখন প্রায় বেকার। এবছর PHD র মেন পেপার জমা দেব ইউনিভার্সিটিতে। এখনই বিয়ে কি করে সম্ভব? তাছাড়া তুমি আগে তো কখনো আমায় বুঝতেও দাও নি।
------ না স্যার। আমিও চাইনি আপনার লেখাপড়ার কোন ক্ষতি হোক। কিন্তু আমার একটি প্রশ্ন আছে । আমি কি সে প্রশ্ন করতে পারি?
হাঁ বলো।
------- স্যার আপনি কি অন্য কাউকে মন দিয়ে রেখেছেন? মানে আপনি কি কাউকে ভালোবাসেন?
তা নয় পারুল। কিন্তু আজই কি করে বিয়ে করা সম্ভব? আমি অপ্রস্তুত। মাকেও জানাতে হবে।
----- সবই সম্ভব স্যার। আমি মাসিমাকে সব বলছি। আপনি আগে দরজাটা বন্ধ করুন। আর আমার বাড়ি থেকে কেউ এলে আপনি বলবেন যে আমি এখানে নেই।
মাসিমা-----
মাসিমা, আমি সৌম দা কে ভালবাসি। আমি সৌমদাকে বিয়ে করতে চাই। আপনি আমাদের পাশে থাকুন। নয়ত আমার খুব বিপদ। বাড়ি থেকে আমার অন্য ছেলের সাথে বিয়ে দেবার চেষ্টা করছে মা বাবা।সেখানে বিয়ে করলে মাসিমা , আমার লেখাপড়া সব শেষ হবে। তাছাড়া আমি ঐ ছেলেকে বিয়ে করতে পারব না। প্লিজ মাসিমা।
আচ্ছা মা। ঠিক আছে। তুই আমার সৌম -র বউ হবি এ আমার চরম সৌভাগ্য।
সৌম….. সৌম…
শুনছিস। এদিকে আয় বাবা।
সৌম আসে, -----হাঁ মা, পারুল আমায় সব বলেছে। আজই ওকে বিয়ে করতে হবে বলছে। তুমি কি রাজি ? নইলে ওর পড়াশুনা বন্ধ হবে।
মাসিমা রাজি হলেন । সেই রাত্রেই সৌম দা র সাথে আমি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলাম। বাড়ির নাড়ুগোপালকে সাক্ষী রেখে মাসিমা আমার ও সৌম দার বিয়ে দিলেন।
পরের দিন সকালে শুনলাম বাবা আমায় কোথাও খুঁজে না পেয়ে থানায় গিয়েছেন। আমি পাড়ার একটি মেয়ের মারফৎ বাড়িতে দাদার কাছে সংবাদটা পাঠালাম আমি বিয়ে করেছি। তারা যেন এই বিষয়ে কোন জল ঘোলা না করে।
চতুর্থ অধ্যায়
এরপর আমি বর্ধমান মেডিকেল কলেজে নার্সিং কোর্সে ভর্তি হলাম। দেখতে দেখতে আমি নার্সিং ও পাশ করে এখন উত্তরবঙ্গে কর্মরত। আমার স্বামী সৌম সেও কলকাতার একটি কলেজে শিক্ষকতা করেন। বেশ সুখী আমরা। আমাদের এক কন্যা। সবে তার বয়স মাত্র ৭ বছর। ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে। হস্ট্রেলে থেকে পড়াশুনা করে। এছাড়া আর তো কোন উপায় নেই। আমার চাকুরীর যা ধরন তাতে ইচ্ছা হলেও উপায় নেই ওকে আমার কাছে রেখে পড়ানোর।
যদিও এতে ওর কোন অসুবিধা হয় না। বেশ অভ্যস্থ হয়ে উঠেছে হস্ট্রেল জীবনে। আমার বাপের বাড়ির সঙ্গেও এখন সম্পর্কের বেশ উন্নতি হয়েছে। দুই বাড়ির সাথে সম্পর্ক প্রথম প্রথম কিছুটা অবনতি ঘটলেও এখন সব ঠিক ঠাক।
নারী শিক্ষার, নারী স্বাধীনতার জন্য যে লড়াই একদিন আমায় করতে হয়েছে তার ফল আজ আমার গ্রামের মেয়েরা পায়। আজ আমার গ্রামে অনেক মেয়েই স্নাতকোত্তর পাশ করে বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষকতা করেন।
( সমাপ্ত)
Comments